Cover মাশ, সুগন্ধি হার্বস এবং লবণ হলো ভিয়েতনামী খাবারের মূল তিনটি উপাদান যা পুরো রন্ধনশৈলীকে এক নতুন মাত্রা দেয়।

ভিয়েতনামী খাবার সবসময়ই সাধারণ মনে হলেও, বিদেশি পর্যটকদের কাছে এগুলি সেখানকার অনন্য ও অদ্ভুত সব উপাদানের কারণে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই প্রয়োজনীয় “উপাদান”গুলোই ভিয়েতনামী রান্নার আসল পরিচয়।

ভিয়েতনামী খাবার সবসময়ই তার সরলতার জন্য জনপ্রিয়। তবে সারা বিশ্বের খাদ্যপ্রেমীদের কাছে ভিয়েতনামী রান্নায় ব্যবহৃত দুর্লভ সব “উপাদান” দারুণ আকর্ষণীয়। প্রতিটি ভিয়েতনামী খাবারের টেবিলে “মাশ” বা ফিশ সস অপরিহার্য। হরেক রকমের সুগন্ধি ওষধি বা হার্বস এই খাবারকে অনন্য করে তোলে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণের ব্যবহার ভিয়েতনামের সংস্কৃতি ও মানুষের হৃদয়ে এক গভীর জায়গা দখল করে আছে।

এই তিনটি সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী “উপাদান” ভিয়েতনামী রন্ধনশিল্পকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলেছে, যা পর্যটকদের বারবার এখানে ফিরিয়ে আনে।

মাশ (Mắm) – ভিয়েতনামী খাবারের আত্মা

Tatler Asia
Above ভিয়েতনামের প্রতিটি খাবারের টেবিলে মাশ বা ফিশ সস একটি অপরিহার্য উপাদান যা ভিয়েতনামী রন্ধনশৈলীর আসল স্বাদ বহন করে।

মাছ থেকে তৈরি এই ফিশ সস প্রাচীন রোমান যুগেও প্রচলিত ছিল। কিন্তু ভিয়েতনামে এটি মানুষের সৃজনশীলতা ও লোকজ প্রজ্ঞার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিকশিত হয়েছে।

পরিবারের প্রতিদিনের খাবারে মাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। মাছের তরকারি, মাংসের পদ বা জনপ্রিয় ভিয়েতনামী প্যানকেকে এই “উপাদান” ছাড়া যেন স্বাদের পূর্ণতা আসে না। বিশেষ করে হিউয়ের বিখ্যাত “মাশ রুওক” বা চিংড়ি পেস্ট তৈরিতে যে ধৈর্য ও শ্রম প্রয়োজন, তা স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন।

বিখ্যাত বুন বো (Bún Bò) বা হিয়েনের বিশেষ খাবারের স্বাদ মাশ রুওক ছাড়া অসম্পূর্ণ। এই উপাদানটি খাবারের গভীরতা বাড়ায় এবং একে বিশ্বমানের করে তোলে।

জানুন: কেন আধুনিক প্রজন্মের শেফদের কাছে ভিয়েতনামী রান্না এত আকর্ষক?

সুগন্ধি হার্বস বা শাকসবজি – রাজকীয় স্বাদের রসদ

Tatler Asia
Above ট্রা কুয়ে গ্রামের সুগন্ধি শাকসবজি ভিয়েতনামী খাবারের স্বাদকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায় যা স্থানীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কোয়াং নাম অঞ্চলের ট্রা কুয়ে গ্রাম সুগন্ধি শাকসবজির জন্য বিশ্বখ্যাত। এই “উপাদান” সাধারণ সবজি হিসেবে নয়, বরং খাবারের মূল স্বাদ বৃদ্ধিকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। ৪০০ বছরের পুরনো এই গ্রামে ২০০টিরও বেশি পরিবার চাষাবাদ করেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, সম্রাট গিয়া লং এই শাকসবজি খেয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি গ্রামের নাম দেন “ট্রা কুয়ে”।

এখানে ৪০টিরও বেশি প্রজাতির হার্ব পাওয়া যায়, যার প্রতিটি আলাদা স্বাদের। এই শাকসবজিগুলো মি কুয়াং বা চাও লাউয়ের মতো খাবারে যোগ হয়ে এক চমৎকার স্বাদের মেলবন্ধন তৈরি করে।

আরও পড়ুন: শেফ ট্রাম আন কীভাবে মিষ্টির জাদুতে জীবনের স্মৃতি ধরে রাখেন?

লবণ – রাজকীয় আয়োজনের অনন্য উপাদান

Tatler Asia
Above লবণ ভিয়েতনামী রান্নায় কেবল স্বাদ বাড়ানোর উপকরণ নয়, বরং এটি প্রাচীন রাজকীয় ঐতিহ্যের এক সূক্ষ্ম ও মার্জিত উপাদান।

ভিয়েতনামী রাজকীয় রান্নায় লবণ এক অসামান্য মর্যাদা পায়। হিউয়ের বিখ্যাত রাজকীয় খাবারে লবণ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পদ পরিবেশন করা হয় যা সুলতানি ঐতিহ্যের প্রতীক।

চুল্লিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় লবণ পুড়িয়ে তাকে বিশুদ্ধ করা হয়, যা পরে বিভিন্ন মাংস বা সবজির সাথে মেশানো হয়। এই “উপাদান” দিয়ে তৈরি খাবারে স্থানীয় কারুশিল্প ও স্বাদের নিখুঁত ভারসাম্য ফুটে ওঠে।

জানুন: ভিয়েতনামী রন্ধনশৈলীতে পঞ্চ উপাদানের দর্শন ও গুরুত্ব।

Tatler Asia
Above দক্ষিণ ভিয়েতনামী রান্নায় বিভিন্ন ধরণের লবণ ও মশলার ব্যবহার খাবারে আনে এক নিখুঁত রাজকীয় স্বাদ যা সকলের কাছে প্রশংসিত।

প্রতিটি পরিবার ও ঋতুভেদে লবণের এই “উপাদান” আলাদাভাবে ব্যবহার করা হয়। শীতকালে ঝাল বা গরম মশলা মেশানো লবণ এবং গ্রীষ্মকালে টক-মিষ্টি স্বাদের লবণের ব্যবহার হয়। এই পদ্ধতিটি কেবল রান্নার কৌশল নয়, বরং এটি পূর্বপুরুষদের বিজ্ঞানমনস্ক ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের এক অনন্য উদাহরণ।


এই নিবন্ধটি ট্যাটলার বেস্ট ২০২৬-এর প্রথম ভলিউমে প্রকাশিত হয়েছে।

আরও পড়ুন:

প্রাচীন এশীয় রন্ধন পদ্ধতির রহস্য: মাটি, বাঁশ ও সময়ের মেলবন্ধন

মৌলিক ও বিশুদ্ধ উপাদানের সাথে আধুনিক রান্নাঘরের নতুন সংমিশ্রণ

ভিয়েতনামী ফাইন ডাইনিং: কী প্রয়োজন আর কী অপ্রয়োজনীয়?