বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম বিস্তারের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ক্রিস্টেল বুকানন উত্তর খুঁজছেন সফটওয়্যার তৈরির প্রকৃত অধিকার কার, যেখানে এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দরজা খুলে যাচ্ছে অগণিত সৃজনশীল মানুষ ও উদ্যোক্তাদের জন্য—সিলিকন ভ্যালির সীমানা ছাড়িয়ে।
ক্রিস্টেল বুকানন তার কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধির যাত্রায়। ২০০০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি টুইটারে যোগ দেন, যখন প্ল্যাটফর্মটি কোটি কোটি মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক কথোপকথনের মূলমন্ত্র নিয়ে এগোচ্ছিল। এরপর তিনি সিঙ্গাপুর ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সোশ্যাল লিসেনিং প্ল্যাটফর্ম ব্র্যান্ডওয়াচ-এর প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যেখানে তিনি অনলাইন ইন্টারঅ্যাকশনের বিশাল ডেটাপ্রবাহকে ব্যবসায়িক অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তর করতে কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করেন। ব্র্যান্ডওয়াচের পর, তিনি বোল্ট (Bolt) প্রতিষ্ঠা করেন, যা এমন সব লাইভ ভিডিও এবং ইন্টারঅ্যাক্টিভ কনটেন্ট নিয়ে কাজ করে যা শিল্পের প্রচলিত গণ্ডির বাইরের দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম।
এই পুরো যাত্রায় একটি চিন্তা তাকে বারবার ভাবিয়ে তুলেছে। প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ালেও, সেগুলো তৈরির ক্ষমতা আজও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতেই সীমাবদ্ধ। তিনি বলেন, “সব প্রযুক্তি কোম্পানি যেন একই ধরনের মানুষের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে, এটা আমাকে অবাক করেছে। তারা স্ট্যানফোর্ড থেকে স্নাতক, কম্পিউটার বিজ্ঞানের ডিগ্রিধারী এবং কোডিং জানে।”
এই চিন্তাই চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড (ChatAndBuild) তৈরির সূচনা করে, যা গত আগস্টে চালু হয়েছে। বুকানন বিশ্বাস করেন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ সাধারণ মানুষকে সত্যিকারের প্রযুক্তিবিদ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিচ্ছে। তিনি এই পরিবর্তনকে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” না বলে “প্রাচুর্যের বুদ্ধিমত্তা” (abundant intelligence) হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “এতদিন সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কোডিং বা কম্পিউটারের সাথে যোগাযোগ করা। এখন ইংরেজি, বাংলা, ভিয়েতনামি, বাহাসা বা থাই—যেকোনো ভাষাই হতে পারে যোগাযোগের সর্বজনীন মাধ্যম।”
এই বিশ্বাস চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড-এর নকশা ও এআই প্রযুক্তির কাঠামোতে প্রতিফলিত হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যে কেউ তার মাতৃভাষায় বর্ণনা দিয়েই প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরি করতে পারে, যা তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল বা ল্যাপটপে কাজ শুরু করে। প্ল্যাটফর্মটি ৪০টিরও বেশি ভাষা সমর্থন করে এবং গিটহাব (GitHub), স্ট্রাইপ (Stripe), সুপাবেস (Supabase)-এর মতো টুল ও ফিগমা-টু-কোড প্রযুক্তি সংযুক্ত করেছে। এটি ওপেনএআই-এর মতো বড় ভাষা মডেল দ্বারা চালিত, যা এমন সব উদ্ভাবক বা উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি যারা নিজেদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ কিন্তু প্রযুক্তিগত কোডিংয়ে দক্ষ নন।
আরও পড়ুন: এআই-এর জনক: আমাদের এমন এআই প্রয়োজন যারা মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে

Above সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ কোডচেলা সম্মেলনে বুকানন, যেখানে এআই প্রযুক্তির প্রবক্তারা নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন (ছবি: চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড)
বুকানন এই অভিজ্ঞতাকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন: “চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড অনেকটা চ্যাটজিপিটি-র মতো, যেখানে আপনি শুধু কথা বলে বা কমান্ড লিখে নিজের পছন্দের অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে পারেন।” ভিয়েতনামের ব্যবহারকারীরা যখন তাদের মাতৃভাষায় মাইক্রোফোনে কথা বলে অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে সক্ষম হলেন, তখন সেটি ছিল একটি বিশেষ মুহূর্ত। বুকানন বলেন, “এটি প্রমাণ করে যে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো ভাষার ব্যবহারকারী সফটওয়্যার নির্মাতা হতে পারেন।”
তিনি কিছু বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন। একজন চিকিৎসক ও গবেষক তার সন্তানদের একজিমা সমস্যার সমাধানে এক রাতেই 'EczemaChecker.com' তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে একটি ব্যবসায়িক প্রকল্পে পরিণত হয়। আবার নয় বছর বয়সী এক শিশু এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি গেম তৈরি করেছে এবং নিজের কমান্ডের মাধ্যমে সেটিকে ত্রিমাত্রিক রূপ দিয়েছে। সে যখন কমান্ড দিল, “গেমটিকে কুকুরের চোখ দিয়ে দেখাও,” তখন পুরো গেমটি সেই অনুযায়ী বদলে গেল।
এই যাত্রায় ওপেনএআই-এর ভূমিকা কেন্দ্রীয়। বুকানন এটিকে তাদের “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক মডেল” হিসেবে উল্লেখ করেন, বিশেষ করে ভয়েস-ভিত্তিক ইন্টারঅ্যাকশনের ক্ষেত্রে। তার মতে, কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে যোগাযোগ মানুষের সাথে প্রযুক্তির গভীরতর সম্পর্ক তৈরি করে। তিনি আরও বলেন, “একসময় কোডিং ছিল কম্পিউটারের সাথে কথা বলার একমাত্র উপায়, কিন্তু প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সুবাদে আজ আমরা মানুষের স্বাভাবিক ভাষা ব্যবহার করেই তা করছি।”
আরও পড়ুন: নারী দিবস: প্রযুক্তি ও এআই দিয়ে ভবিষ্যৎ নতুন করে লিখছেন যে নারীরা
চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড এমনভাবে তৈরি যেখানে কমান্ড বা প্রম্পট স্ট্রাকচার অপ্টিমাইজ করা যায়, যাতে ব্যবহারকারী যা চান তা সঠিকভাবে প্রযুক্তি বুঝতে পারে।
কোম্পানির নতুন পণ্য 'চ্যাটচ্যাট' (ChatChat) অ্যাপ্লিকেশন তৈরির ধারণাটিকে ব্যক্তিগত স্মার্ট এজেন্টের সাথে সহযোগিতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড যদি তৈরির মাধ্যম হয়, তবে চ্যাটচ্যাট হলো যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবহারকারী তাদের নিজস্ব স্মার্ট এজেন্ট তৈরি করতে পারে। বুকানন এটিকে কোম্পানির “এজেন্ট প্ল্যাটফর্ম” বলেন। ব্যবহারকারী তাদের স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত সময়সূচি বা স্ল্যাক (Slack) থেকে তথ্য পেতে এই এজেন্টকে নির্দেশনা দিতে পারে, যা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে কাজ করে। উদ্দেশ্য শুধু স্বয়ংক্রিয়তা নয়, বরং তথ্য সমন্বয় করা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা।
সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের ওপর তিনি বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন। চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড বিভিন্ন কোম্পানি, পরিবার, শিশু এবং উইমেন ইন এআই (Women in AI)-এর মতো সংগঠনের সাথে কাজ করছে। বুকানন মনে করেন, এআই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা মূলত এটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম ও সুযোগের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, “আমরা কেবল তাদের কাছেই পৌঁছাচ্ছি না যারা এআই নিয়ে আগ্রহী, বরং তাদের কাছেও পৌঁছাচ্ছি যারা এর কথা আগে কখনো ভাবেননি।”
সিঙ্গাপুর থেকে শুরু করাটা চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড-এর জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল। বুকানন বিশ্বাস করেন, সিঙ্গাপুরের বহুভাষিক ও বৈচিত্র্যময় সমাজ বিশ্বব্যাপী ব্যবহারের উপযোগী পণ্য তৈরির একটি আদর্শ পরীক্ষার ক্ষেত্র। তিনি বলেন, “এআই কেবল পশ্চিম বা পূর্বের জন্য নয়, এটি সবার জন্য।” এই দ্বীপরাষ্ট্রটি এমন একটি স্থান যেখানে বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষার সাথে স্থানীয় বৈচিত্র্যের মিলন ঘটে।
আগামী দশ বছরে আমরা হয়তো বর্তমান এই এআই বিপ্লবকে ভিন্নভাবে দেখব। বুকানন বলেন, “অনেকে এখনো এআই-কে কেবল একটি চ্যাটবট মনে করেন, কিন্তু মূলত এটি একটি সুপার-কম্পিউটার।” চ্যাটঅ্যান্ডবিল্ড-এর মূল ভিত্তিই হলো এই বিশ্বাস যে, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কেবল সিলিকন ভ্যালির প্রকৌশলীদের হাতে সীমাবদ্ধ নয়। যেকোনো ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা মানুষ এখন তাদের নিজস্ব ভাষা ও দক্ষতা দিয়ে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অংশ নিতে পারবেন।
এই নিবন্ধটি Tatler Global-এর হাসিরিন নুরিন হাশিমির লেখা “ChatAndBuild founder Christel Buchanan on how AI is changing who builds the next big app” থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।




