Cover ৮৮ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ডেভিড হকনি, আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী (ছবি: রয়টার্স)

৮৮ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন ডেভিড হকনি, যিনি সমসাময়িক শিল্পকলার অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী। চিত্রকলা, আলোকচিত্র থেকে ডিজিটাল আর্ট—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

ডেভিড হকনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকে অসাধারণ কৌতূহলের দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে নতুন এক দৃশ্যপট হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ৮৮ বছর বয়সে তার প্রয়াণের সংবাদে বিশ্ব শিল্পকলা জগৎ শোকস্তব্ধ। তিনি শুধু একজন ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং আধুনিক শিল্পকলায় চলমান এক নবজাগরণের প্রতীক ছিলেন।

১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ডে জন্মগ্রহণকারী ডেভিড হকনি যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শিল্পকলায় পা রাখেন এবং ১৯৬০-এর দশকে দ্রুত ব্রিটিশ শিল্পকলার অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। তার বিশেষত্ব ছিল তিনি কখনোই কোনো নির্দিষ্ট শৈলীতে আবদ্ধ থাকেননি। তেলরঙের ক্যানভাস থেকে শুরু করে ডিজিটাল আইপ্যাড আর্ট—সব ক্ষেত্রেই তিনি খুঁজেছেন পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখার উপায়।

Tatler Asia
Above তরুণ বয়সে খ্যাতিমান শিল্পী ডেভিড হকনি
Tatler Asia
Above শিল্পকলার জগতে অমর নাম শিল্পী ডেভিড হকনি
Tatler Asia
Above নিজের শিল্পকর্মের মাঝে ডেভিড হকনি
Tatler Asia
Above ডেভিড হকনির সৃষ্টি “প্লে উইদিন আ প্লে উইদিন আ প্লে অ্যান্ড মি উইথ আ সিগারেট” (২০২৪-২৫)

অনেকের কাছে ডেভিড হকনি মানেই ক্যালিফোর্নিয়ার উজ্জ্বল রৌদ্রোজ্জ্বল নীল সুইমিং পুলের দৃশ্য। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার আড়ালে ছিলেন একজন অনুসন্ধানী শিল্পী, যিনি প্রতিনিয়ত প্রশ্ন তুলেছেন কীভাবে মানুষ ছবি দেখে এবং মনে রাখে। তার মতে, প্রথাগত আলোকচিত্র সময়কে স্তব্ধ করে দেয়, কিন্তু মানুষের চোখ ক্রমাগত গতিশীল। তিনি সেই দর্শন থেকেই ফটো কোলাজ ও মাল্টি-পয়েন্ট পার্সপেক্টিভে বৈপ্লবিক পরীক্ষা চালিয়েছিলেন।

তার প্রয়াণ শিল্পজগতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করলেও, তার রেখে যাওয়া কাজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের শিল্পী ও নকশাকারদের নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে।

আরও পড়ুন: [নাউজেন] স্থপতি ও ডিজাইনার এনগুয়েন কিউ লাম এবং তার সৃজনশীল স্থাপত্য ভাবনা

সমসাময়িক দৃশ্যমান সংস্কৃতি ও ডেভিড হকনি

Tatler Asia
Above “দ্য স্প্ল্যাশ” (১৯৬৭), ডেভিড হকনির অমর সৃষ্টি

ডেভিড হকনির কথা বললে প্রথমেই মনে পড়ে ১৯৬৭ সালের বিখ্যাত ছবি “আ বিগার স্প্ল্যাশ”-এর কথা। সুইমিং পুলে জল ছিটিয়ে পড়ার মুহূর্তটি তিনি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যেখানে কোনো মানুষ ছিল না। কেবল আলো, গতি এবং এক অদ্ভুত প্রশান্তিই ছিল ছবির প্রাণ।

এই ছবিটি আধুনিক শিল্পের অন্যতম আইকনিক প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়, যা ক্যালিফোর্নিয়াকে আলো ও স্বাধীনতার দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করে।

আরও পড়ুন: [নাউজেন] ওহকোয়োর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ত্রয়ী: ছোট জিনিসের বিশাল গল্প

Tatler Asia
Above “মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ক্লার্ক অ্যান্ড পার্সি” (১৯৭১)
Tatler Asia
Above “দ্য ড্যান্সার্স ভি” (২০১৪)

পাশাপাশি তার পোর্ট্রেটগুলো সমসাময়িক প্রতিকৃতি শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তিনি সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাগুলো ফুটিয়ে তুলতে রঙের বিন্যাস ও আলোর ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতেন।

ডেভিড হকনি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোকে এক অনন্য দৃষ্টিতে দেখে বিশ্বজুড়ে পপ সংস্কৃতির সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছিলেন।

দৃশ্যমান শিল্পকলার নতুন সীমানা

Tatler Asia
Above “পিয়ারব্লসম হাইওয়ে” (১৯৮৬) - ডেভিড হকনির অনন্য কাজ

ডেভিড হকনির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল শিল্পের প্রথাগত ধারণা নিয়ে নিরন্তর প্রশ্ন তোলা।

আশির দশকে তিনি শত শত পোলারয়েড ছবি দিয়ে তৈরি করেছিলেন “জয়নার্স” নামক শিল্পকর্ম। প্রথাগত একক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে এই কাজগুলো মানুষের চোখের গতির অনুকরণে তৈরি, যা ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তকে একীভূত করে এক নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।

Tatler Asia
Above “গ্যারোবি হিলস” (১৯৯৮)

ডেভিড হকনির মতে, জগৎ কেবল এক দিক থেকে দেখার বিষয় নয়। আমরা সবকিছু চারপাশ ঘুরে দেখি এবং স্মৃতিগুলো বিভিন্ন মুহূর্তের সংমিশ্রণ। তার এই দর্শন ডিজিটাল যুগের শিল্পকলার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির এই যুগে হকনি বহু আগেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—একটি ছবিতে কি একই সঙ্গে অনেক সময় ও দৃষ্টিভঙ্গি রাখা সম্ভব?

ভবিষ্যৎমুখী এক শিল্পীর চিরন্তন উত্তরাধিকার

Tatler Asia
Above আইপ্যাডে আঁকা ও কাগজে মুদ্রিত “ফুল ব্লুম” (২০২০)

ডেভিড হকনির সাফল্যের সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো তিনি কখনোই নিজের সাফল্যের শিকলে বন্দি হননি।

তিনি যখন অন্য অনেক শিল্পী পুরোনো পদ্ধতিতে কাজ করছিলেন, তখন তিনি আইফোন ও আইপ্যাডের মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে শিল্পের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। ৮০ বছর বয়সেও তার কাজগুলো ছিল তরুণদের মতো প্রাণবন্ত ও গবেষণাধর্মী।

Tatler Asia
Above “পুল উইথ টু ফিগারিনস” (১৯৭২)

ডেভিড হকনির প্রভাব কেবল একজন চিত্রশিল্পী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সৃজনশীলতার এক জ্বলন্ত প্রতীক। তার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, আধুনিক শিল্পকলা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখা সম্ভব।

নয় দশকের দীর্ঘ পথচলা শেষে ডেভিড হকনি বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া প্রশ্ন ও দৃষ্টিভঙ্গি আজও সমসাময়িক শিল্পকলার প্রতিটি পাতায় বেঁচে থাকবে। সম্ভবত এটিই তার শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার।

এখনই পড়ুন

[নাউজেন] এম-এন অ্যাসোসিয়েটসের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর এনগুয়েন বাও আনহ ডুয়ি: টেকসই ব্র্যান্ডিংয়ের যাত্রা

গ্লোবাল ওয়েলনেস ডে ২০২৬: কর্মক্ষেত্রের চাপ থেকে মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার ৩ উপায়

গ্লোবাল কে-বিউটি সেনসেশন এপিআর এবার টাইম ম্যাগাজিনের সেরা ১০০ তালিকায়