২০১৭ সালে ফিফার স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে নাভি পিল্লাই পদত্যাগ করেন। নয় বছর পর, এই দক্ষিণ আফ্রিকান আইনজ্ঞ পেলেন ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার। এই অর্জনের পেছনে রয়েছে প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ লড়াই, যা বর্ণবাদী কারাগার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের বৈশ্বিক সমতা প্রচারাভিযানে বিস্তৃত।
২০১৭ সালের মে মাসে, দুর্নীতি কেলেঙ্কারির পর ফিফা (FIFA) যখন নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ব্যস্ত, নাভি পিল্লাই তখন গভর্ন্যান্স কমিটি থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। কমিটির প্রধান মিগুয়েল পোয়ারেস মাদুরোকে পুনর্নিয়োগ না করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তিনি এই পদক্ষেপ নেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল রুশ উপ-প্রধানমন্ত্রী ভিটালি মুতকোর ফিফা কাউন্সিলে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক। পিল্লাই ও তার সহযোগীদের নজরে পিল্লাই-এর কাজের ক্ষেত্রে নাভি পিল্লাই ও তার নীতিবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: [শিক্ষা ও প্রভাব] নোবেল টিচার সামিট ২০২৬: জ্ঞানের কম্পাস
মাদুরোর কমিটি মুতকোর প্রার্থিতা প্রত্যাখ্যান করেছিল কারণ তার রাজনৈতিক পদ ফিফার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। মাদুরো অভিযোগ করেছিলেন যে, রাশিয়া বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ায় ফিফা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চাপ দিচ্ছিলেন। যদিও ফিফা তা অস্বীকার করে। পিল্লাই তার পদত্যাগপত্রে ফিফার নীতি নৈতিকতার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো সংস্থার নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেন না যারা নিজের করা মানদণ্ড নিজেই লঙ্ঘন করে।
একজন ৭৬ বছর বয়সী নারী হিসেবে তার এই দৃঢ় সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। একজন প্রাক্তন মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবে নাভি পিল্লাই সবসময়ই স্বচ্ছতা ও সততার প্রতীক। নয় বছর পর, ৯ অক্টোবর ২০২৬-এ তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। এর মাধ্যমে নাভি পিল্লাই নেলসন ম্যান্ডেলার মতো কিংবদন্তিদের সারিতে নিজের স্থান করে নিলেন।
নিষিদ্ধ গ্রন্থাগার থেকে আন্তর্জাতিক আদালত
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের ক্লেয়ারউডে নাভি পিল্লাই জন্মগ্রহণ করেন। বর্ণবাদের চরম দুঃসময়ে বেড়ে ওঠা নাভি পিল্লাই অনেক বাধা পেরিয়ে নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল প্রদেশে প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে আইন পেশায় ব্যক্তিগত চেম্বার খোলেন। কিন্তু সেই সময়কার বর্ণবাদী আইনে তার সীমাবদ্ধতা ছিল অনেক। এমনকি তাকে শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত আইনি লাইব্রেরি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হতো না।
আইনজীবী হিসেবে নাভি পিল্লাই সবসময় রাজনৈতিক বন্দিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি রবেন দ্বীপে বন্দি নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্যান্য বন্দিদের আইনি সহায়তার অধিকার রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে নাভি পিল্লাই তার অদম্য সাহসের পরিচয় দেন।

Above নোবেল জয়ী নাভি পিল্লাই, যিনি সারা জীবন ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
ম্যান্ডেলার আর্কাইভ থেকে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে বন্দিদশা থেকে গোপনে পাঠানো চিঠিতে তিনি নাভি পিল্লাই-এর পরামর্শ ও সহায়তা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের সুরক্ষায় তিনি ১৯৮৬ সালে পরামর্শ কেন্দ্র গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান।
১৯৯৫ সালে তিনি রুয়ান্ডার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখানে জিন-পল আকায়েসু মামলায় তার রায় আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় এক নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করে। তিনি প্রথমবারের মতো ঘোষণা করেন যে, যুদ্ধকালীন সময়ে যৌন সহিংসতাও গণহত্যার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই সাহসী ভূমিকার জন্য নাভি পিল্লাই আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সমতার লড়াই
রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) পৌঁছে দেয়। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালনের পর তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে ছয় বছর অতিবাহিত করেন। এই সময়ে তিনি সিরিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সোচ্চার ছিলেন।
তবে নাভি পিল্লাই-এর সবচেয়ে অনন্য কাজ ছিল ২০১৩ সালে চালু করা “ফ্রি অ্যান্ড ইকুয়াল” ক্যাম্পেইন। এটি ছিল এলজিবিটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস ও নাভি পিল্লাই-এর দূরদর্শী নেতৃত্ব এখানে মূল ভূমিকা পালন করেছিল।

Above মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রতিকৃতি নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য নাভি পিল্লাই সর্বজনবিদিত।
এই প্রচারাভিযানটি সারা বিশ্বে এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। নাভি পিল্লাই নিজে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সমতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আফগানিস্তানের নারীদের ওপর তালিবানের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে “জেন্ডার অ্যাপার্থেইড” শব্দটি ব্যবহার করে সোচ্চার হয়েছেন। নাভি পিল্লাই সবসময় নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যু নিয়ে তার পরিচালিত কমিশন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। ২০২৫ সালে তার কমিশন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরূপ পর্যবেক্ষণ প্রদান করে। যদিও ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদনের তীব্র বিরোধিতা করা হয়।
নিউরেনবার্গে নোবেল অর্জন
৯ অক্টোবর ২০২৬-এ জার্মানির নুরেমবার্গের সেই ঐতিহাসিক আদালত কক্ষ থেকে যখন নাভি পিল্লাই নোবেল পুরস্কারের খবর পান, তখন তা ছিল এক নাটকীয় মুহূর্ত। এই কক্ষেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধীদের বিচার হয়েছিল। ৮৫ বছর বয়সী নাভি পিল্লাই তখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের জন্য। আন্তর্জাতিক আদালতে তার আইনি লড়াই এখনো চলমান।
নোবেল কমিটি নাভি পিল্লাই-এর অটল সাহসিকতা ও আইনি নিরপেক্ষতাকে কুর্নিশ জানিয়েছে। নাভি পিল্লাই তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থা দুর্বল হলে মানবসভ্যতা সংকটে পড়বে। তার দীর্ঘ কর্মজীবন বর্তমান প্রজন্মের আইনজীবীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।

Above নোবেল জয়ী হওয়ার পর নাভি পিল্লাই-এর ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে নাভি পিল্লাই সারা জীবনের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বজুড়ে অভিনন্দিত হয়েছেন।
তার দীর্ঘ পথচলায় নাভি পিল্লাই কখনোই থেমে থাকেননি। আজ নাভি পিল্লাই শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও ন্যায়ের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তার কাজ ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
অবশ্যই পড়ুন
ট্যাটলার ফ্রন্ট অ্যান্ড ফিমেল অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬: নারী অগ্রগামীদের অনুপ্রেরণা
ভিয়েতনাম-অস্ট্রেলিয়া: এআই ও সেমিকন্ডাক্টরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একত্রে
রোলেক্স অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬: রেইচেল ইকেমেহ ও নাইজার বদ্বীপ পুনরুদ্ধার




