Cover ভ্যু দিন লং: এই বিস্মৃত বা quên হওয়া প্রকাশনা গুরুর অবদান অপরিসীম।

সংস্কৃতির ধারক ও বাহকদের যদি যথাযথ সম্মান জানানো হয়, তবে যারা এই সংস্কৃতিকে উৎপাদনের ও প্রচারের অবকাঠামো তৈরি করেছিলেন, তাদের প্রায়শই ভুলে যাওয়া হয়। এই বিস্মৃত মাস্টার বা “quên” ব্যক্তিত্বদের একজন হলেন ভ্যু দিন লং।

এইরকমই একজন মানুষ ছিলেন ভ্যু দিন লং (১৮৯৬-১৯৬০), যিনি ছিলেন তান ডান প্রকাশনীর কর্ণধার, যা আগস্ট বিপ্লবের আগে ভিয়েতনামের বৃহত্তম প্রকাশনা সাম্রাজ্য ছিল। ১৯২৫ সালে ৮০০ ইন্দোচিনি দোং মূলধন নিয়ে শুরু করে, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে তান ডান ৫০০ কর্মী ও ১.২ মিলিয়ন দোং মূল্যের যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ একটি ছাপাখানা গড়ে তোলে। তাদের এই “quên” হওয়ার মতো বিশাল প্রকাশনা ব্যবস্থা ও কয়েক হাজার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নগুয়েন তুয়ান, ভ্যু বাং, নাম কাও-এর মতো লেখকদের জন্য এক অনন্য মঞ্চ তৈরি হয়েছিল। এমনকি তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তু লুস ভ্যান দোয়ানও তাদের পত্রিকা ছাপানোর জন্য তান ডানের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

আরও পড়ুন: শিল্পী খান ত্রান: কমিকস আঁকার স্বপ্ন থেকে শিল্পের কারিগর হয়ে ওঠার গল্প

প্রবণতার অগ্রদূত

ভ্যু দিন লংয়ের কর্মজীবন যেন তার ছেলে চিত্রশিল্পী ভ্যু ডান তান (১৯৪৬-২০০৯)-এর মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। ১৪ আগস্ট, ভ্যু দিন লংয়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ভ্যু ডান তান জাদুঘরে এক নতুন প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে। দর্শকরা এখানে তার পাণ্ডুলিপি, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন ও পোস্টকার্ড দেখার সুযোগ পাবেন। ১৬ আগস্ট, জাদুঘরটি “সীমান্ত পেরিয়ে শব্দ: ভ্যু দিন লং - লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশক” শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে। ড. দোয়ান আন দুং, ড. নগো তু লাপ এবং অধ্যাপক নগো ভান গিয়া তাদের গবেষণাপত্রে ভ্যু দিন লংয়ের এই বিস্মৃত বা “quên” অবদানের কথা তুলে ধরেন, যেখানে তিনি একাধারে একজন শিল্পী ও উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯১৭ সালে আলবার্ট সারো শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনার ফলে ভিয়েতনামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়, যা সাহিত্য ও সংবাদপত্রের জন্য এক নতুন পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করে। ১৯২১ সালে ভ্যু দিন লং তার নাটক “চেন থুওক ডক” (বিষের পেয়ালা) প্রকাশের মাধ্যমে ভিয়েতনামের আধুনিক নাট্য ধারার সূচনা করেন। ১৯২৫ সালে তিনি একটি ছোট বইয়ের দোকান দিয়ে শুরু করে পরে এটি বিশাল প্রকাশনা সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তার সৃজনশীল সত্তা ও সমাজের বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া বা “quên” সত্তাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

Tatler Asia
Above ভ্যু দিন লংয়ের প্রাচীন প্রকাশনার নিদর্শন এবং তার সৃজনশীল যাত্রার প্রতিফলন এই ঐতিহাসিক সংগ্রহের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।

১৯৩৪ সালে তু লুস ভ্যান দোয়ান গ্রুপ সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে বিশাল প্রকল্প শুরু করে। তাদের সাথে তান ডানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তু লুস ভ্যান দোয়ানের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তান ডান তার নিজস্ব ছাপাখানা ও পত্রিকার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে। কিন্তু সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই যেন আমাদের স্মৃতি থেকে “quên” বা বিস্মৃত হয়ে যায়, ঠিক যেমন ভ্যু দিন লংয়ের বিশাল অবদান এক সময় চাপা পড়ে গিয়েছিল।

Tatler Asia
Above তান ডান প্রকাশনীর আর্কাইভাল সংগ্রহ ভিয়েতনামের সাহিত্যিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৪৩ সালে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তান ডান বন্ধ হয়ে গেলে ভ্যু দিন লং পুনরায় লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। তিনি দেশের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে ফরাসি নাটকগুলোকে ভিয়েতনামী ভাষায় অনুবাদ ও রূপান্তর করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ভিয়েতনাম রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে যোগদান করেন। তার জীবন ও কর্মের এই বিস্মৃত বা “quên” অধ্যায়গুলো আজ ভ্যু ডান তান জাদুঘরের মাধ্যমে নতুন করে গবেষণার আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষক

তু লুস ভ্যান দোয়ান এবং তান ডানের মধ্যকার এই লড়াই ছিল একটি সাংস্কৃতিক লড়াই। যেখানে তু লুস ভ্যান দোয়ান ছিল আদর্শিক, সেখানে তান ডান ছিল বাজারের চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া এক প্রকাশনী। তবে দিনশেষে, তারা উভয়েই নতুন প্রজন্মের পাঠক ও শিল্পীদের পুষ্ট করেছে। আজ অনেক মানুষ হয়তো ভ্যু দিন লংয়ের নাম “quên” বা ভুলে গেছেন, কিন্তু তার কাজের প্রভাব আধুনিক ভিয়েতনামী প্রকাশনা শিল্পে আজও বিদ্যমান।

আরও পড়ুন: আর্তে ফেয়ার: চিল্লালা আর্ট হাউসে ২০ জনেরও বেশি শিল্পীর শিল্পমেলা

Tatler Asia
Above ভিয়েতনামের শিল্পকলা ও সাহিত্যিক বিবর্তনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ফুটে উঠেছে এই প্রদর্শনীতে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ভ্যু দিন লং ও তু লুস ভ্যান দোয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদের শেখায় যে শিল্প ও ব্যবসা—উভয়ই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আজ আমরা হয়তো অনেক কিছু “quên” বা বিস্মৃত হতে দেখি, কিন্তু যখনই অতীতের এই সমৃদ্ধ ইতিহাসের দিকে তাকাই, তখনই ভ্যু দিন লংয়ের মতো ব্যক্তিত্বদের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়।

Tatler Asia
Above ভ্যু দিন লংয়ের কর্মজীবনের আর্কাইভাল ডকুমেন্টেশন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।

ইতিহাস কেন ভ্যু দিন লংয়ের নাম “quên” বা ভুলে গেল? তার নাটকের বিষয়বস্তু—যেখানে আধুনিক নারী ও তাদের সামাজিক বিচ্যুতির চিত্রায়ন ছিল—সময়ের সাথে সাথে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য। আজকের ভ্যু ডান তান জাদুঘর নিশ্চিত করছে যে, তার এই দীর্ঘ যাত্রার কথা আর বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাবে না।


১৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে, ভ্যু ডান তান জাদুঘর ভ্যু দিন লংয়ের উত্তরাধিকারের সম্মানে নতুন একটি বিশেষ কক্ষ উদ্বোধন করেছে।

জাদুঘরের নির্বাহী পরিচালক নাতালিয়া ক্রায়েভস্কায়া জানান: “ভ্যু দিন লংয়ের এই জায়গাটি আধুনিক ভিয়েতনামী নাট্যতত্ত্বের গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।”