Cover মনেট গার্ডেন, যেখানে শিল্প ও প্রকৃতি একাকার। ছবি: থাই লিন। মনেট গার্ডেন-এর এক অপূর্ব শরৎকালীন দৃশ্য।

ইতিহাস প্রায়শই আকস্মিক ঘটনার মাধ্যমে রচিত হয়। ১৮৮৩ সালে ভার্ননের ট্রেন যাত্রায় ক্লদ মনেট (Claude Monet) যদি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে না তাকাতেন এবং প্যারিস থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম গিভার্নিকে (Giverny) প্রথম দেখাতেই ভালো না বাসতেন, তবে শিল্পকলার ইতিহাস আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। এরপরই তিনি তাঁর পুরো পরিবারসহ সেখানে চলে আসেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই অতিবাহিত করেন।

গিভার্নিতে কাটানো চল্লিশ বছরেরও বেশি সময়ে তিনি নিজের জীবনের এক সবুজ অভয়ারণ্য তৈরি করেছিলেন, যা ছিল মূলত একটি পার্থিব স্বর্গ এবং বাগান তৈরির শিল্পের এক জীবন্ত নিদর্শন। মনেট গার্ডেন-এ, যেখানে ইমপ্রেশনিজম বা ইমপ্রেশনিস্ট ধারার চিত্রকলা জন্ম নিয়েছিল, তিনি তাঁর বাগানের শত শত ছবি এঁকেছিলেন। সেই ছবিগুলো আজ বিশ্বের প্রধান জাদুঘরগুলোতে সংরক্ষিত। ক্লদ মনেট এবং তাঁর এই অমর মনেট গার্ডেন শিল্পের ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন:

আর্টে ফেয়ার: চিল্লালা হাউস অফ আর্টে ২০ জনেরও বেশি শিল্পীর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী

শিল্পী খান ত্রান: কমিকস আঁকার স্বপ্ন থেকে শিল্পীদের মনন গঠনের পথে

Tatler Asia
Above আইরিস ফুলের বাগানে পথ, ১৯১৪–১৯১৭, ক্লদ মনেট, মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট, নিউ ইয়র্ক। ছবি: থাই লিন (Thái Linh), মনেট গার্ডেন-এর এক অনন্য দৃশ্য।

“আমার সেরা সৃষ্টি হলো আমার বাগান।” মনেট বলেছিলেন। গিভার্নিতে তাঁর মনেট গার্ডেন হলো একজন চিত্রশিল্পীর দৃষ্টি এবং বাগান করার প্রতি তাঁর অনুরাগের এক অসাধারণ মেলবন্ধন। চিত্রকলা এবং বাগান করা—এই দুটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। তাঁর বাগান ছিল রং এবং আলোর এক দারুণ খেলা, যা তিনি অত্যন্ত যত্ন ও পরিকল্পনার সাথে সাজাতেন।

মনেট অত্যন্ত যত্নশীলভাবে তাঁর বাগানের প্রতিটি ফুলের রং, উচ্চতা এবং ফোটার সময় খেয়াল করতেন। তিনি বাগান সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্রিকা সংগ্রহ করতেন এবং তাঁর গ্রন্থাগারে ইউরোপীয় উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে অসংখ্য বই ছিল। মনেট গার্ডেন তৈরি করা তাঁর কাছে চিত্র আঁকার মতোই ছিল; প্রতিটি গাছের অবস্থান এমনভাবে ঠিক করতেন যেন তা একটি জীবন্ত ক্যানভাস হয়ে ওঠে।

Tatler Asia
Above শরৎকালে গিভার্নিতে মনেট গার্ডেন-এর নয়নাভিরাম দৃশ্য। মনেট গার্ডেন সারা বিশ্বে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

তিনি বাগানে গভীরতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতেন। লম্বা গাছগুলোকে পেছনে এবং ছোট গাছগুলোকে সামনে রাখতেন, যেন একটি ছবির স্তর থাকে। লতানো গোলাপ, জাপানি উইস্টেরিয়া এবং সুগন্ধি ফুল দিয়ে সাজানো তোরণগুলো দর্শকদের বাগানের গভীরে টেনে নিত। মনেট গার্ডেন-এ পানির প্রতিফলন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তিনি ওয়াটার লিলি বা শাপলা ফুল ও উইলো গাছগুলো এমনভাবে সাজাতেন যাতে পানির উপর ছায়া পড়ে এক অপার্থিব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

তিনি জাপানি সংস্কৃতির দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং তাঁর বাগানে বাঁশ, শাপলা ফুল ও জাপানি ব্রিজের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। এই শাপলা ফুলের পুকুরই মনেট গার্ডেন-এর হৃদয়ে পরিণত হয়েছিল।

Tatler Asia
Above শরৎকালীন মনেট গার্ডেন-এর স্নিগ্ধ আভা। মনেট গার্ডেন-এর এই গাছপালা প্রকৃতিপ্রেমীদের মন কাড়ে।
Tatler Asia
Above মনেট গার্ডেন-এর শান্ত পরিবেশ। মনেট গার্ডেন সারা বছরই পর্যটকদের জন্য এক বিশেষ স্থান।
Tatler Asia
Above মনেট গার্ডেন-এর জাপানি ধাঁচের ব্রিজ। মনেট গার্ডেন স্থাপত্য ও প্রকৃতির এক অপূর্ব মিশ্রণ।

পুকুরের শাপলা ফুলগুলো ছিল মনেট গার্ডেন-এর সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। তিনি ৩০ বছর ধরে এগুলো এঁকে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি অন্য কিছু আঁকতে পারি না। এই শাপলা ফুলগুলো আমার মন জয় করে নিয়েছে।” এই পুকুরটি ছিল তাঁর আশ্রয়, যেখানে তিনি প্রকৃতির প্রশান্তি খুঁজে পেতেন।

তিনি প্রতিদিন মনেট গার্ডেন-এ পরিশ্রম করতেন। যদিও বাগানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মালির সাহায্য নিতেন, তবুও প্রতিটি ফুলের বিন্যাস তিনিই নিজে নির্ধারণ করতেন। তাঁর কাছে মনেট গার্ডেন ছিল ইমপ্রেশনিজমের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, যেখানে আলো, রং এবং মুহূর্তের সৌন্দর্যের মেলবন্ধন ঘটত।

Tatler Asia
Above মনেট গার্ডেন-এ ক্লদ মনেট-এর প্রিয় জাপানি ব্রিজ। ক্লদ মনেট তাঁর মনেট গার্ডেন-এ অনেক বিখ্যাত ছবি এঁকেছেন।

নিজের এই মনেট গার্ডেন-এ বসেই তিনি ২৫০টিরও বেশি ওয়াটার লিলি চিত্রকর্ম তৈরি করেন। তাঁর কাজগুলো প্যারিসের মারমোটান মিউজিয়াম, নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম সহ সারা বিশ্বের বড় বড় প্রদর্শনীতে শোভা পাচ্ছে। ২০০৮ সালে তাঁর একটি চিত্রকর্ম নিলামে রেকর্ড পরিমাণ দামে বিক্রি হয়েছিল, যা ক্লদ মনেট ও তাঁর মনেট গার্ডেন-এর কালজয়ী জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়।

Tatler Asia
Above জার্মানির বারবেরিনি মিউজিয়ামে ক্লদ মনেট-এর শিল্পকর্ম। মনেট গার্ডেন-এর চিত্রকলার প্রদর্শনী।
Tatler Asia
Above ক্লদ মনেট-এর আঁকা মনেট গার্ডেন-এর দৃশ্য। মনেট গার্ডেন বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পের উৎস।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে মনেট প্রায় পুরো সময়টাই তাঁর মনেট গার্ডেন-এর উন্নতির জন্য ব্যয় করতেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বাগানের নতুন গাছপালা নিয়ে কথা বলছিলেন। ১৯২৬ সালে তাঁর মৃত্যুর পর বাগানটি কিছুটা অযত্নে পড়ে থাকলেও, ১৯৭৬ সালে জেরাল্ড ভ্যান ডের ক্যাম্পের চেষ্টায় মনেট গার্ডেন পুনরায় তার পুরনো রূপে ফিরে আসে।

বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ লক্ষ পর্যটক মনেট গার্ডেন দেখতে আসেন। শরৎকালে এর সৌন্দর্য আরও মোহময় হয়ে ওঠে। মনেট গার্ডেন-এর সেই নিস্তব্ধতা এবং সৌন্দর্যের মাঝে আজও যেন ক্লদ মনেট-এর তুলির আঁচড় খুঁজে পাওয়া যায়। এই মনেট গার্ডেন সত্যিই শিল্প ও প্রকৃতির এমন এক মিলনস্থল, যা মানুষের হৃদয়কে আজও নাড়া দেয়।

Tatler Asia
Above শরতের শেষ বিকেলে মনেট গার্ডেন। মনেট গার্ডেন-এ প্রকৃতির এক অন্য রূপ ফুটে ওঠে।
Tatler Asia
Above মনেট গার্ডেন-এর শান্ত জলের ধারায় শরতের আভা। মনেট গার্ডেন যেন এক জীবন্ত ছবি।
Tatler Asia
Above মনেট গার্ডেন-এর গাছপালার ছায়া। মনেট গার্ডেন-এ আলো-ছায়ার খেলা অবিরাম।
থাই লিন
অবদানকারী, Tatler Vietnam
Tatler Asia