আফগানিস্তানের এক ছোট ফুটবল মাঠ থেকে বিশ্বমঞ্চে নারী অধিকারের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা খালিদা পোপাল, যিনি তাঁর নির্বাসনের যন্ত্রণাকেই পরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য “টাটলার জেন.টি সামিট ২০২৬”-এ যোগ দেওয়ার আগে তাঁর জীবন ও নেতৃত্বের পাঠ তুলে ধরলেন তিনি।
উঁচু কংক্রিটের দেয়ালঘেরা এক ধুলোমাখা মাঠে একদল শিশুকন্যার হাসির শব্দ ভেসে এল। একটি পুরোনো ফুটবল এক পা থেকে অন্য পায়ে গড়াল, আর দুটি পাথরের টুকরো গোলপোস্টের কাজ করল। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি সাধারণ খেলা হতে পারে, কিন্তু আফগান কন্যাদের কাছে এই ফুটবল মাঠে দৌড়ানো মানেই ছিল স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া। সমাজ যখন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, তখন এই কয়েকটা ঘণ্টা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিত। এই কন্যাদের মধ্যেই একজন ছিলেন খালিদা পোপাল, যিনি পরবর্তীকালে আফগানিস্তানের নারী ফুটবল দলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও অধিনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ফুটবলের মাধ্যমে অগণিত নারীর সমানাধিকারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন।
এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। বরং এর প্রতিটি ধাপে ছিল হুমকি, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। কিন্তু খালিদা পোপাল বুঝেছিলেন যে, ফুটবলের আসল শক্তি কেবল জেতার মধ্যে নয়, বরং মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে নিহিত।
আজ, খালিদা পোপাল “গার্ল পাওয়ার অর্গানাইজেশন”-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। তাঁর এই সংগঠন ফুটবলকে একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে নারী ও শরণার্থীদের মাঝে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। আগামী ২৭ ও ২৮ অক্টোবর ব্যাংককের সায়াম প্যারাগনে আয়োজিত “টাটলার জেন.টি সামিট ২০২৬”-এ তিনি তাঁর এই অমূল্য অভিজ্ঞতার গল্প ভাগ করে নেবেন।
যখন ফুটবল হয়ে ওঠে ভাগ্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
খালিদা পোপাল আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বড় হয়েছেন। নব্বইয়ের দশকে তালেবানের শাসনামলে নারীদের শিক্ষা ও জনজীবনে চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০০১ সালে তালেবান শাসনের অবসানের পর দেশে ফিরে তিনি প্রথম ‘শরণার্থী’ হওয়ার অর্থ বুঝতে পারেন। তিনি উপলব্ধি করেন, শিক্ষা ও স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার যে কোনো মুহূর্তে কেড়ে নেওয়া হতে পারে।
কাবুলে ফিরে তিনি মায়ের স্কুলের আঙ্গিনায় ফুটবল খেলতে শুরু করেন। শুরুতে কেবল সামিরা নামের এক বন্ধু ও খালিদা খেলতেন, কিন্তু ধীরে ধীরে আরও অনেক শিক্ষার্থী যোগ দিলে তা একটি দলে রূপ নেয়। মাঠ বা জুতো প্রস্তুত না থাকলেও, ফুটবল খেলার আনন্দই তাদের কাছে ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
তবে এই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। একদিন কিছু পুরুষ মাঠে ঢুকে তাদের ফুটবলটিকে ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে এবং তাদের হুমকি দেয়। কিন্তু এই ঘটনা খালিদা পোপালকে ভেঙে দেয়নি, বরং শিখিয়েছে যে পিছিয়ে যাওয়া মানেই অধিকার বিসর্জন দেওয়া। তাঁর আত্মজীবনী “মাই বিউটিফুল সিস্টারস”-এ তিনি লিখেছেন, “মাঠ আমাদের চিন্তা করার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শিখিয়েছে, যা সমাজ আমাদের থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল।”
ছোট দল থেকে পুরো দেশের নারীর কন্ঠস্বর
খালিদা পোপালের ফুটবল প্রেম একটি জাতীয় মিশনে পরিণত হয়। ২০০৭ সালে তিনি আফগানিস্তানের প্রথম জাতীয় নারী ফুটবল দলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও অধিনায়ক হন। ফুটবলের মাধ্যমে তিনি পুরো বিশ্বকে বার্তা দেন যে, নারীরা কেবল খেলোয়াড় নয়, বরং তারা নিজেই নিজেদের ভবিষ্যতের নির্মাতা। তাঁর জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে হুমকিও। ফলে ২০১০-এর দশকের শুরুতে বাধ্য হয়েই দেশ ছাড়তে হয় তাঁকে এবং ডেনমার্কে শুরু হয় তাঁর নতুন জীবন।
আরও পড়ুন: দাবার বোর্ডে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো জুডিথ পোলগার: সব সীমাবদ্ধতা ভাঙার গল্প
গার্ল পাওয়ার: শরণার্থীদের জীবনের নতুন ঠিকানা
ডেনমার্কে পৌঁছে খালিদা পোপাল গঠন করেন “গার্ল পাওয়ার অর্গানাইজেশন”। তাঁর লক্ষ্য ছিল খেলাধুলা ও শিক্ষার মাধ্যমে শরণার্থী নারীদের ক্ষমতায়ন করা। তিনি বিশ্বাস করেন, শরণার্থীরা কেবল সাহায্যপ্রার্থী নয়, বরং নতুন সমাজের উন্নয়নে তাদের বড় ভূমিকা থাকতে পারে। এই সংগঠন এখন ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
ফুটবল যখন জীবনেরক্ষার মিশনে পরিণত হয়
২০২১ সালে তালেবান আবারও ক্ষমতা দখল করলে খালিদা পোপাল তাঁর অসীম সাহস নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আফগানিস্তানের নারী ফুটবলারদের নিরাপদে দেশ থেকে বের করে নিয়ে যান। তাঁর এই কাজ ছিল মানবিকতা আর একতা রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি জানতেন, নির্বাসনের যন্ত্রণা কী, তাই প্রতিটি ফুটবলারকে নিরাপদে রাখা ছিল তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার।
ট্রফির চেয়েও বড় এক জয়
দেশ ছাড়ার পরও খালিদা পোপাল লড়াই থামাননি। তিনি ফিফার সাথে কাজ করে “আফগান উইমেন ইউনাইটেড” দল গঠনে সহায়তা করেন, যাতে নির্বাসিত নারী ফুটবলাররা আবারও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন। এটি কেবল খেলা নয়, এটি ছিল নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার লড়াই।

Above খালিদা পোপাল ২০১৭ সালে জুরিখে ফিফার সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্মেলনে বক্তৃতারত, যেখানে তিনি নারী খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। (ছবি: ভ্যালেরিয়ানো দি ডোমেনিকো - ফিফা via গেটি ইমেজ)
২০২৬ সালের এপ্রিলে ফিফার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে নির্বাসিত দলগুলোকে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। খালিদা পোপালের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসল এই বিজয় আফগান নারী ফুটবলারদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তিনি গর্ব করে বলেন, “পরিচয় হারিয়ে ফেলা কঠিন, কিন্তু আমরা সবাই মিলে সেই পরিচয় ফিরে পেয়েছি।”
মাঠ ছাড়িয়েও যে কন্ঠস্বর গর্জে ওঠে
খালিদা পোপালের মিশন এখনো শেষ হয়নি। তিনি মনে করেন, খেলাধুলা ও রাজনীতি আলাদা কিছু নয়। বিশেষ করে যখন প্রশ্নটি নারী অধিকারের হয়, তখন চুপ থাকার কোনো অবকাশ নেই। তিনি ইরানের নারী ফুটবলারদের সুরক্ষার বিষয়েও বারবার সরব হয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে মানুষের জন্য কথা বলা একটি নৈতিক দায়িত্ব।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে তিনি স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে মিলে শরণার্থী শিশুদের জন্য ফুটবল ক্যাম্প পরিচালনা করেছেন। তাঁর মতে, খেলাধুলার ব্যবসায়িক সাফল্যের চেয়ে এর সামাজিক প্রভাব ও কমিউনিটির উন্নয়নে অবদানের দিকে বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

Above খালিদা পোপাল এবং নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই মেলবোর্নের একটি ফুটবল মাঠে আফগান নারী ফুটবল দলের সঙ্গে দেখা করেন। (ছবি: কেলি ডেফিনা/গেটি ইমেজ)
আত্মবিশ্বাস থেকেই নেতৃত্বের জন্ম
খালিদা পোপালের নেতৃত্বের ধরন প্রথাগত নয়; তিনি পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে লড়াই করা শিখেছেন। ছোট একদল ফুটবলার থেকে শুরু করে আজ তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত একজন নেতা। তাঁর এই নেতৃত্ব ও সাহসের গল্পই “টাটলার জেন.টি সামিট ২০২৬”-এর মূল উপজীব্য হবে।
সামিটে তিনি জানাবেন কীভাবে বিশ্বাস তৈরি করতে হয় এবং একটি অভিন্ন লক্ষ্যে মানুষকে একজোট করে পরিবর্তন আনা সম্ভব। খালিদা পোপাল আমাদের দেখিয়েছেন যে, পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক না কেন, নিজের বিশ্বাস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে বদলে দেওয়া সম্ভব।
যখন পৃথিবী আফগানিস্তানের কথা ভুলে যেতে শুরু করে, তখনও আমাদের কন্ঠস্বর থামবে না, কারণ আমরাই সেইসব নারীর একমাত্র কন্ঠস্বর যাদের কথা বলার আর কোনো সুযোগ নেই।





