লগারিদমিক স্পাইরাল থেকে শুরু করে মুড-সেটিং ফিল্টার—জানুন কেন বিশ্বজুড়ে সুন্দর বাড়িগুলোতে একটি “লাইট” বা পিএইচ ল্যাম্প থাকা আবশ্যক।
“Once you have experienced good lighting, life is filled with new values.” ডেনিশ ডিজাইনার এবং উদ্ভাবক Poul Henningsen-এর এই উক্তিটি মোটেও অতিরঞ্জিত নয়। একটি ঘরের মুড ও পরিবেশ তৈরিতে আলোর গুরুত্ব অপরিসীম, যা সাধারণ স্পেসকেও অসাধারণ করে তুলতে পারে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, যারা বিশ্বজুড়ে তাদের রুচিশীল ডিজাইনের জন্য পরিচিত, সেখানে সঠিক “লাইট” বা আলোকসজ্জা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের কাছে আলো মানে শুধু অন্ধকার দূর করা নয়, বরং প্রাকৃতিক সূর্যের আলো ও মোমবাতির কোমল আভা ঘরে ফিরিয়ে আনা। তারা সাধারণত ছাদের মাঝখানে একটি উজ্জ্বল বাতি না জ্বালিয়ে ঘরের বিভিন্ন কোণে নান্দনিক ল্যাম্প ব্যবহার করে পরিবেশকে আরও আরামদায়ক করে তোলে। তাদের এই আলোকসজ্জার দর্শন সারা বিশ্বের আধুনিক ঘর সাজানোর কৌশলে প্রভাব ফেলেছে।
আরও পড়ুন: Verner Panton-এর ১০টি আইকনিক ডিজাইন, যা সময়ের ঊর্ধ্বে

Above একটি ঘরে সঠিক আলোকসজ্জা ও শৈল্পিক ল্যাম্পের গুরুত্ব অপরিসীম।

Above ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের প্রিয় হলো নান্দনিক ও আরামদায়ক ল্যাম্প।
আলোকসজ্জার কথা বললে Louis Poulsen-এর নাম না নিলে চলে না। ১৮৭৪ সালে ওয়াইন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরু করলেও, ১৮৯২ সালে কোপেনহেগেনে বিদ্যুৎ আসার সাথে সাথে তারা এই আলোকসজ্জার ব্যবসায় প্রবেশ করে। ১৯২০-এর দশকে Poul Henningsen বা PH-এর সাথে তাদের এই ঐতিহাসিক পার্টনারশিপ আলোকসজ্জার জগতকে চিরতরে বদলে দেয়।
PH তৎকালীন সময়ের সাধারণ উজ্জ্বল ও বিরক্তিকর আলো পছন্দ করতেন না। তিনি এমন এক 'System PH' উদ্ভাবন করেন যা মানুষকে নতুন করে আলোর সঙ্গে পরিচিত করায়। আসুন দেখে নেওয়া যাক কেন তার নকশা করা এই “লাইট” বা বাতিগুলো আজ প্রায় ১০০ বছর পরেও সমান জনপ্রিয়।

Above Louis Poulsen-এর ক্ল্যাসিক ও শৈল্পিক ল্যাম্প ডিজাইন।

Above আধুনিক অন্দরসজ্জায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরণের চমৎকার বাতি।

Above ঘরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য আধুনিক আলোর ব্যবহার।
১. শামুক ও প্রকৃতির আদলে আলোকসজ্জা
পিএইচ ল্যাম্পের বক্ররেখাগুলো দেখলে মনে হতে পারে এগুলো আধুনিক শিল্পের অংশ, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের কারিশমা। PH প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত 'Logarithmic Spiral' বা লগারিদমিক সর্পিল রেখা ব্যবহার করেছেন, যা শামুকের খোলস বা গ্যালাক্সিতে দেখা যায়।
গণিত ও শিল্পের এই সমন্বয় আলোর বিচ্ছুরণকে করে তোলে অত্যন্ত কোমল ও মনোরম। এটি প্রমাণ করে যে, শিল্পের সৌন্দর্যের পেছনেও নিখুঁত গাণিতিক সূত্র থাকতে পারে, যা আমাদের ঘরের “লাইট”-কে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

Above প্রকৃতির আদলে গাণিতিক নির্ভুলতায় ডিজাইন করা ল্যাম্পের ছায়া।

Above পিএইচ ল্যাম্পের চমৎকার এবং দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন।

Above শৈল্পিক বাতি ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরের পরিবেশ বদলানো যায়।

Above নান্দনিক আলোকসজ্জার এক অনন্য উদাহরণ এই ল্যাম্পগুলো।
২. বাল্ব লুকানোর কৌশল
পিএইচ ল্যাম্প তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সরাসরি চোখের ওপর আসা বিরক্তিকর আলো দূর করা। তিনি এমন এক সিস্টেম তৈরি করেছিলেন যেখানে বাল্ব সরাসরি দেখা যায় না, বরং বাতির আবরণ বা শেড আলোকে সুশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে দেয়।
তার এই “লাইট” ডিজাইনগুলো অনেকটা ছোট স্থাপত্যের মতো, যা বাল্বের উজ্জ্বলতাকে আটকে দিয়ে ঘরে এক স্নিগ্ধ ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে। এটি মানুষের শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে তৈরি করা একটি অসাধারণ উদ্ভাবন।

Above বাল্ব না দেখে সরাসরি তার স্নিগ্ধ আলো উপভোগ করার প্রযুক্তি।

Above আলোকসজ্জার সৌন্দর্য ও উপযোগিতার নিখুঁত সংমিশ্রণ।

Above আধুনিক অন্দরসজ্জায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের আলোকসজ্জা সরঞ্জাম।
৩. ৫০-এর দশকের মুড সেটিং ফিল্টার
১৯৫৮ সালে PH এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেন যা আধুনিক মুড-সেটিং ফিল্টারের মতোই কাজ করত। তার পিএইচ ৫ ল্যাম্পে লাল ও নীল রঙের প্রতিফলন প্লেট ব্যবহার করা হয়েছিল, যা আলোর রঙকে আরও উষ্ণ ও আকর্ষণীয় করে তুলত।
এটি ডাইনিং টেবিলে খাবারের রঙ আরও সুন্দর করে তুলত এবং মানুষের ত্বকের ওপর আলোর আভা খুব স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত দেখাত। যদিও আজকের প্রযুক্তিতে আলোর গুণমান অনেক বেড়েছে, কিন্তু সেই যুগের এই চিন্তাধারা ছিল বিপ্লবের সমান।
আরও পড়ুন: কোপেনহেগেনের ৩দিনের ডিজাইন উৎসবের সর্বশেষ ট্রেন্ড

Above রঙের ভারসাম্য রক্ষাকারী আলোকসজ্জার সরঞ্জাম।

Above পিএইচ ল্যাম্পের মাধ্যমে ঘরে তৈরি হয় এক নান্দনিক পরিবেশ।

Above পিএইচ ল্যাম্পের অনন্য ডিজাইনের প্রতিফলন।
৪. ১৪০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় তৈরি তিন স্তরবিশিষ্ট কাঠামো
পিএইচ ল্যাম্পের তিন স্তরবিশিষ্ট ডিজাইন কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এর প্রকৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিটি স্তর আলো নিয়ন্ত্রণ, ছড়িয়ে দেওয়া এবং চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কাজ করে।
এই বাতিগুলো তৈরি হয় তিন স্তরবিশিষ্ট ওপাল গ্লাস দিয়ে, যা ১,৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হাতে তৈরি করা হয়। লুইস পোলসেন সম্প্রতি এর ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ব্রোঞ্জ ও অন্যান্য উন্নত উপাদান ব্যবহার করে এক নতুন কালেকশন উপহার দিয়েছেন, যা আধুনিক ঘরকেও করে তুলবে আভিজাত্যপূর্ণ।

Above উন্নত তাপমাত্রায় হাতে তৈরি ওপাল গ্লাসের চমৎকার ল্যাম্প।

Above ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে তৈরি ল্যাম্পের নতুন কালেকশন।

Above আলোকসজ্জায় উচ্চমানের উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করে দীর্ঘস্থায়িত্ব।
৫. গোপন সংখ্যাতাত্ত্বিক কোড
পিএইচ ৪/৩ বা ৩/২-এর মতো মডেলের সংখ্যাগুলো কেবল নাম নয়, বরং এগুলো বাতির আকারের গোপন কোড। প্রথম সংখ্যাটি বাতির উপরের অংশের ব্যাস প্রকাশ করে, যা ডিজাইনের সূক্ষ্ম গাণিতিক অনুপাত নির্দেশ করে।
এই অনুপাত ব্যবহারের মাধ্যমে আলোর দিক পরিবর্তন করা সহজ হয়। যেমন, ছোট শেডের ল্যাম্পগুলো আলো সরাসরি নিচের দিকে নিক্ষেপ করে, যা পড়ার জন্য বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানকে উজ্জ্বল করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর।

Above বিভিন্ন আকারের পিএইচ ল্যাম্প যা ঘরের আলো নিয়ন্ত্রণ করে।

Above নির্দিষ্ট স্থানের জন্য বেছে নিন সঠিক মডেলের পিএইচ ল্যাম্প।

Above আধুনিক অন্দরসজ্জায় ব্যবহৃত বিভিন্ন শৈল্পিক বাতি।
একশ বছর আগে তৈরি এই আলোকসজ্জার সিস্টেম আজো আধুনিক ঘর সাজানোর মানদণ্ড। যারা পিএইচ ল্যাম্পের এই অনন্য “লাইট” বা আলোকসজ্জার জাদুকরী অভিজ্ঞতা নিতে চান, তারা ঘুরে আসতে পারেন সুকুমভিত ৪৯-এর নর্স স্টোর (NORSE Store) থেকে।
সেখানে চলছে “PH Centenary Traveling Exhibition”, যেখানে আপনি লুইস পোলসেনের ১০০ বছরের বিবর্তন ও তাদের নতুন পিএইচ সেন্টেনারি কালেকশন সরাসরি দেখতে পারবেন। এই প্রদর্শনী আগামী ৩০ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। হয়তো একটি সঠিক বাতিই আপনার ঘরকে করে তুলবে স্বপ্নের মতো সুন্দর।

Above প্রদর্শনীতে আলোকসজ্জার নতুন ও পুরাতন মডেলের সমাবেশ।
Topics














