অ্যাপলের নতুন সিইও হিসেবে জন টার্নাসের যাত্রা শুরু হলো। অ্যাপল ও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল দায়িত্ব এখন তার হাতে, যিনি তিন দশক ধরে কোম্পানির খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ করছেন।
জুলাই মাসের শেষে কিউপারটিনোতে অ্যাপলের কর্মীদের এক সভায় জন টার্নাস উপস্থিত হন। অ্যাপল কোম্পানির নতুন সিইও হিসেবে টিম কুকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তিনি। ২৫ বছর আগে পণ্য নকশা দলের একজন প্রকৌশলী হিসেবে যাত্রা শুরু করে আজ তিনি কোম্পানির সর্বোচ্চ পদে। টার্নাস তার প্রাক্তন সহকর্মীদের সঙ্গে অ্যাপলের পরবর্তী কয়েক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তার কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা ও যেকোনো কঠিন সমস্যা সমাধানের দৃঢ় বিশ্বাস তাকে সবার কাছে শ্রদ্ধেয় করে তুলেছে।
কিছুদিন পর, অ্যাপলের ইতিহাসে অন্যতম বড় পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। ৫১ বছর বয়সী টার্নাস ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল স্মার্টফোন “আইফোন ডুও”-এর নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে আইফোনের নকশায় বড় কোনো পরিবর্তন না এলেও, অ্যাপল তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পণ্যটিতে ফোল্ডেবল স্ক্রিন ও নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করেছে, যার মূল্য শুরু হয়েছে ১,৯৯৯ ডলার থেকে।
আরও পড়ুন: টিম কুকের উত্তরসূরি হিসেবে জন টার্নাস কি অ্যাপলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন?
অদৃশ্য খুঁটিনাটির নিখুঁত কারিগর
টার্নাসের সিইও হওয়ার পথটি স্টিভ জবস বা টিম কুকের চেয়ে একেবারেই আলাদা। জবস ছিলেন দূরদর্শী, আর কুক ছিলেন সরবরাহ ও পরিচালনা ব্যবস্থাপনার মাস্টারমাইন্ড। অন্যদিকে, টার্নাস উঠে এসেছেন পণ্যের একদম ভেতর থেকে—ম্যাক, আইপ্যাড, এয়ারপড থেকে শুরু করে নতুন আইফোনের চিপ ডিজাইন পর্যন্ত সবকিছুর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। তাকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা তাকে একজন “প্রকৃত প্রকৌশলী” বলে অভিহিত করেন।

Above অ্যাপলের নতুন সিইও জন টার্নাস তার প্রকৌশল মেধা দিয়ে উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
টার্নাসের কর্মজীবনের অনেক গল্পই শুরু হয় কোনো এক সূক্ষ্ম ত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে। ২০০১ সালে অ্যাপলে যোগ দেওয়ার পর, তিনি যখন সিনেমা ডিসপ্লে নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন কারখানায় স্ক্রুয়ের খাঁজের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। তিনি নিজে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করে ভুল ধরিয়ে দিয়েছিলেন। অ্যাপল পণ্যের খুঁটিনাটির প্রতি তার এই বিশেষ দৃষ্টিই তাকে সবার থেকে আলাদা করে তুলেছে।

Above অ্যাপলের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার ও পণ্যের ডিজাইনে জন টার্নাসের বিশেষ অবদান রয়েছে।
টার্নাস অ্যাপলে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই হাতে-কলমে কাজ করতে পছন্দ করতেন। প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন তিনি নিজেই মেশিনে যন্ত্রপাতি তৈরি করতেন। অ্যাপলের আইম্যাক, আইপ্যাড ও ৫জি আইফোনের মতো বড় প্রজেক্টগুলোতে তিনি তার এই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। যেকোনো মিটিংয়ে পণ্যের ওজন, উপাদানের মান বা স্থায়িত্ব নিয়ে তিনি সব তথ্য চোখের নিমেষে বলে দিতে পারেন। অ্যাপল পণ্যগুলোতে তার এই গভীর সম্পৃক্ততা আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের রূপকার
আইফোন তৈরির শুরুর দিকে টার্নাস প্রকৌশলীদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে কাজ করতেন। যখন আইফোন-২ এর কেসিং নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন, তখন তিনি আইম্যাক দলের প্রকৌশলীদের কাছ থেকে শেখা আলোর প্রতিফলন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ত্রুটি সারিয়েছিলেন। তার এই সমন্বয় ক্ষমতা অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার দলের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে, যা আজ অ্যাপল পণ্যের সাফল্যের মূল ভিত্তি।

Above জন টার্নাস অ্যাপল দলের সদস্যদের সঙ্গে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করছেন।
আইপ্যাডের ক্ষেত্রেও টার্নাসের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সমন্বয়ে আইপ্যাডের জন্য আলাদা অপারেটিং সিস্টেম তৈরির ধারণা দিয়েছিলেন, যা বর্তমানে মাল্টিটাস্কিং ও কিবোর্ড সাপোর্টের মাধ্যমে ল্যাপটপের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। অ্যাপল পণ্যের এই বিবর্তন তারই হাত ধরে এগিয়েছে।

Above অ্যাপল পণ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে জন টার্নাস সব সময় উৎকর্ষের ওপর জোর দিয়েছেন।
বর্তমানে নতুন আইফোন ডুও-এর মতো প্রজেক্টগুলোতেও টার্নাসের সেই প্রকৌশলীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হচ্ছে। ফোল্ডেবল স্ক্রিন ও নতুন ব্যাটারি ম্যানেজমেন্টের জটিল প্রযুক্তিগুলো তিনি খুব নিপুণভাবে পরিচালনা করছেন। যদিও বাজারে এই ধরনের পণ্যের চ্যালেঞ্জ অনেক, তবুও অ্যাপল তার মানের জায়গা থেকে কোনো ছাড় দিচ্ছে না।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওজন
অ্যাপল পণ্যে টাচ বারের মতো ব্যর্থ প্রজেক্টে তার ভূমিকা থাকলেও, টার্নাস ভুল থেকে শিখতে দ্বিধা করেননি। যখন কোনো নতুন প্রযুক্তি অ্যাপল ব্যবহারকারীদের জন্য কার্যকর হয়নি, তিনি তা সরিয়ে ফেলার সাহসী সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। এখন তিনি আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যাটারি লাইফ, কর্মক্ষমতা এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ওপর।

Above অ্যাপল পণ্যের উন্নয়ন ও মান বজায় রাখা জন টার্নাসের অন্যতম লক্ষ্য।
ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে অ্যাপল এখন আরও বেশি সতর্ক। হোমপড বা স্মার্ট হোমের মতো ক্ষেত্রে অ্যাপল কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, এখন তারা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সেই জায়গা দখল করতে চায়। জন টার্নাসের নেতৃত্বে অ্যাপল এখন এমন পণ্য তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে, যা মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।

Above অ্যাপল এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন ঘরোয়া প্রযুক্তিতে মনোযোগ বাড়াচ্ছে।
টার্নাস সব সময় বিশ্বাস করেন যে, প্রযুক্তি কেবল বাজারে ছাড়ার জন্য নয়, বরং তা মানুষের জীবনে কী অভিজ্ঞতা তৈরি করছে সেটাই মুখ্য। তিনি তার সময় ও শ্রম দিয়ে অ্যাপলকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান, যেখানে পণ্য আর কেবল যন্ত্র নয়, মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

Above জন টার্নাস ভবিষ্যতের অ্যাপল পণ্য নিয়ে তার নতুন পরিকল্পনা শেয়ার করছেন।
আজ অ্যাপলের হাজার হাজার প্রকৌশলীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল সিদ্ধান্ত আসছে জন টার্নাসের হাত ধরে। আইফোন ডুও কেবল একটি নতুন शुरुआत, অ্যাপলের আগামী দিনের পথচলায় তিনি আরও বড় চমক নিয়ে আসবেন বলে আশা করা যায়।
আরও পড়ুন:
৭১ বছর বয়সে ডোনাটেলা ভারসাচের নতুন ব্র্যান্ডের সঙ্গে ফ্যাশনে প্রত্যাবর্তন
ওয়েলনেস উইকএন্ড - স্টেট অফ ব্যালেন্স: প্রশান্তিময় জীবনে ফিরে আসা
ট্যাটলার জেন.টি হল ২০২৬ - ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী তরুণদের মিলনস্থল
Topics




