বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফুটবলাররা এখন মাঠের বাইরেও বড় বড় ব্যবসায়িক চুক্তি করে সাফল্য পাচ্ছেন, যার কেন্দ্রে রয়েছে ফুটবল ও এর বাণিজ্যিক প্রভাব।
ফুটবলের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়রা ক্রমশ মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে তাদের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত করছেন। তারা তাদের উপার্জিত অর্থ ও ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডকে বিভিন্ন কোম্পানি, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগে কাজে লাগাচ্ছেন। দুই দশক আগেও যা কেবল মাঝে মাঝে স্পনসরশিপ বা বুট এন্ডোর্সমেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন সুপরিকল্পিত ব্যবসায়িক আগ্রহে পরিণত হয়েছে। ফুটবল বিশ্বকাপের নামিদামি খেলোয়াড়দের জন্য এই কার্যক্রমগুলো এখন তাদের আয় ও পরিচিতির এক বিশাল অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের খেলার মাঠের আয়কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই উদ্যোগগুলোর ধরনও বেশ বৈচিত্র্যময়। কেউ কেউ পণ্যের লাইসেন্সিংয়ের জন্য তাদের নাম ব্যবহার করছেন, আবার কেউ ফ্যাশন, আতিথেয়তা, প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য খাতের কোম্পানিগুলোর প্রতিষ্ঠাতা বা মালিক হচ্ছেন। অনেকে মিডিয়া প্রোডাকশনের দিকে ঝুঁকছেন এবং পডকাস্ট, ডকুমেন্টারি ও কন্টেন্ট স্টুডিও চালু করছেন, যা সরাসরি ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। আরও উচ্চাভিলাষী খেলোয়াড়রা ইউরোপ ও আমেরিকার ফুটবল ক্লাবগুলোর মালিকানায় অংশীদারিত্ব নিচ্ছেন, যা ফুটবল ব্যবসার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
এই সবকিছুর মাঝে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে: অ্যাথলেটিক খ্যাতিকে বাণিজ্যিক সম্পদে রূপান্তর করা। যেহেতু পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের স্বর্ণালি সময় খুব সংক্ষিপ্ত, তাই দীর্ঘস্থায়ী সম্পদ ও প্রভাব তৈরির এই প্রবণতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজ এক প্রজন্মের ফুটবলাররা নিজেদের কেবল খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং ব্র্যান্ডের মালিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করছেন, যা ফুটবল খেলার বাইরের জীবনকেও সমৃদ্ধ করছে।
আরও পড়ুন: হংকংয়ে প্রথম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো জাদুঘর খোলার প্রস্তুতি চলছে
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী বাণিজ্যিক পোর্টফোলিওগুলোর একটি গড়ে তুলেছেন, যার ব্যবসায়িক মূল্য প্রায় ১.২ থেকে ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইতিহাসে প্রথম সক্রিয় ফুটবলার হিসেবে তিনি বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। তার জীবনধারা ব্র্যান্ড “CR7” অন্তর্বাস, জুতো, সুগন্ধি এবং চোখের চশমাসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করে।
আতিথেয়তা ও স্বাস্থ্য খাতে, তিনি পেস্তানা হোটেল গ্রুপের সঙ্গে অংশীদারিত্বে বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল হোটেল চেইন “পেস্তানা CR7” চালু করেছেন, যার শাখা লিসবন, মাদেইরা, মাদ্রিদ, নিউ ইয়র্ক এবং মারাকেশে অবস্থিত। এছাড়া তিনি ব্যবসায়ী পাওলো রামোসের সঙ্গে মিলে “ইনস্পারিয়া” ব্র্যান্ডের অধীনে হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিক এবং নিজস্ব ব্র্যান্ডের ফিটনেস জিমের মালিক।
তার বাণিজ্যিক প্রভাব সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনুসারীবিশিষ্ট ব্যক্তিগত প্রোফাইল, যা থেকে তিনি স্পনসরড কন্টেন্টের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১২৫ থেকে ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেন। নাইকির সঙ্গে তার ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের আজীবন চুক্তির পাশাপাশি হার্বালাইফ, ক্লিয়ার এবং আরমানির মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে তার বহুমুখী বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে, যা তাকে ফুটবল ব্যবসায় এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে রেখেছে।
কিলিয়ান এমবাপে
কিলিয়ান এমবাপে তার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ, ইমেজ রাইটস এবং স্কেলেবল মিডিয়ার ওপর কৌশলগত জোর দিয়েছেন, যা থেকে তিনি বছরে প্রায় ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেন। ২০২০ সালে, তিনি “জেব্রা ভ্যালি” নামের একটি প্রোডাকশন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যা চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন খাতে কন্টেন্ট তৈরি করে।
তার ব্যক্তিগত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান “কোয়ালিশন ক্যাপিটাল” প্রযুক্তি এবং স্পোর্টস পারফরম্যান্স ইক্যুইটিতে আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিধানযোগ্য বায়োমেট্রিক প্ল্যাটফর্ম এবং অ্যাথলেট ডেটা অ্যানালিটিক্সে বিনিয়োগ। এছাড়া মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি ফরাসি ক্লাব স্তাদ মালের্ব কান-এর প্রায় ৮০ শতাংশ মালিকানা কিনে ফুটবল জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
তিনি তার বাণিজ্যিক ইমেজ রাইটসের ওপর কঠোর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। নাইকি, ডিওর এবং হাবলটের মতো গ্লোবাল ব্র্যান্ডের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তার উপস্থিতি ফুটবল ব্যবসার জগতে তার দক্ষতাকে প্রমাণ করে। একইসঙ্গে তিনি প্যারিসে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য “ইনস্পায়ার্ড বাই কেএম” ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক সুযোগ তৈরি করছেন।
নেইমার
নেইমার তার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বাণিজ্যিক ও এন্ডোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ২০২০ সালে নাইকি ছেড়ে পুমার সাথে তার ঐতিহাসিক চুক্তিটি তার ব্যবসায়িক পোর্টফোলিওকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
তিনি গেমিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে সক্রিয় এবং ই-স্পোর্টস স্টার্টআপগুলোতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া তিনি ব্রাজিলে নিজস্ব ফাউন্ডেশন “ইনস্টিটিউট নেইমার জুনিয়র”-এর মাধ্যমে খেলাধুলা ও শিক্ষার বিশাল কমপ্লেক্স পরিচালনা করছেন, যা হাজার হাজার দরিদ্র শিশুর কল্যাণে কাজ করছে।
সাদিও মানে
সাদিও মানে অন্যদের থেকে আলাদা কারণ তিনি তার আয়ের সিংহভাগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্থানীয় উন্নয়নে ব্যয় করেন। তিনি সেনেগালের বাম্বালিতে নিজের গ্রামে একটি আঞ্চলিক হাসপাতাল, উচ্চ বিদ্যালয়, ফুয়েল স্টেশন, পোস্ট অফিস এবং ফোর-জি ইন্টারনেট অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন।
এছাড়াও তিনি স্থানীয় পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নিয়মিত মাসিক ভাতা প্রদান করেন, যা তার ফুটবল মাঠের বাইরের মানবিক ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে।





