স্মার্টওয়াচ প্রতিদিন আপনাকে আপনার রেস্টিং হার্ট রেট বা বিশ্রামকালীন হৃদস্পন্দনের তথ্য দেয়, কিন্তু এর অর্থ সবসময় স্পষ্ট নয়। এই সংখ্যাটি আসলে কী ইঙ্গিত করে, তা জেনে নিন।
প্রতিদিন সকালে আপনার স্মার্টওয়াচ কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আপনাকে আপনার রেস্টিং হার্ট রেট বা হার্ট রেট (heart rate) সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করে। আপনার স্মার্টফোনের হেলথ অ্যাপে স্টেপ কাউন্ট এবং স্লিপ স্কোরের মাঝামাঝি জায়গায় আপনি “রেস্টিং হার্ট রেট” (RHR) নামের একটি সংখ্যা দেখতে পান। হয়তো আপনার হার্ট রেট মিনিটে ৫৮ বার, আবার অন্য কারো হতে পারে ৭২। স্বভাবতই আমরা মনে করি, যার হার্ট রেট ৫৮, তিনিই বোধহয় সবচেয়ে সুস্থ।
এই ধারণার কিছুটা ভিত্তি অবশ্যই আছে। নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম হৃদস্পন্দনের গতি কমাতে সাহায্য করে এবং যারা দীর্ঘস্থায়ী অ্যাথলেট, তাদের ক্ষেত্রে এটি ৬০-এর নিচে থাকা স্বাভাবিক। তবে, এই সংখ্যাটি আপনার নিজের শারীরিক পরিবর্তনের গতিপথ বোঝার জন্য বেশি কার্যকর। অন্যদের সঙ্গে তুলনার ক্ষেত্রে এই হার্ট রেট খুব একটা সঠিক নির্দেশক নয়।
আরও পড়ুন: গ্লুকোজ মনিটর কি ডায়াবেটিস নেই এমন ব্যক্তিদের জন্য জরুরি?
“স্বাভাবিক” হার্ট রেট কী?
শান্ত ও বিশ্রামরত অবস্থায় আপনার হৃদপিণ্ড প্রতি মিনিটে কতবার স্পন্দিত হয়, সেটাই হলো রেস্টিং হার্ট রেট। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতি মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক। হার্ট রেট কম হওয়া মানেই ভয়ের কিছু নেই। মানসিক চাপ, হরমোনের প্রভাব, ওষুধ এবং শারীরিক সক্রিয়তা এই মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই পরিসীমা অনেক ব্যাপক হলেও গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। ৪৬টি গবেষণার একটি মেটা-বিশ্লেষণে ১২ লক্ষেরও বেশি মানুষের তথ্যে দেখা গেছে, রেস্টিং হার্ট রেট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবে এই ধরনের গবেষণা সামগ্রিক গোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত লক্ষ্য নয়। কম হার্ট রেট মানেই যে সুস্থতা, তা নয়; এটি জিনগত বা ওষুধের প্রভাবেও হতে পারে। অনেক সময় হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিক ধীরগতি হৃদরোগের সংকেতও হতে পারে।
মিস করবেন না: ক্যামেরার সামনে ত্বক কেমন দেখাবে, তা মেকআপ শিল্পীরা কীভাবে বোঝেন?
নিজের স্বাভাবিক হার্ট রেট জানুন
চিকিৎসকের কাছে একবার চেক-আপ করলে কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু একটি ওয়্যারেবল ডিভাইস মাস বা বছর জুড়ে আপনাকে শত শত তথ্য দেয়। স্ক্রিপস রিসার্চ-এর এক গবেষণায় ৯২,৪৫৭ জন মার্কিন নাগরিকের ৩.৩ কোটি হার্ট রেট ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় গড় হার্ট রেট ৬৫ বিপিএম (bpm) হলেও, ব্যক্তিগত গড়ের সীমা ৪০ থেকে ১০৯ বিপিএম পর্যন্ত হতে পারে। একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংখ্যা সাধারণত সপ্তাহে মাত্র তিনবার উঠানামা করে। গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, প্রতি ব্যক্তির একটি নিজস্ব “স্বাভাবিক হার্ট রেট” থাকে, যার পরিবর্তন শারীরিক সমস্যার সংকেত দিতে পারে।
এখান থেকেই আপনার স্মার্টওয়াচের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারো সাধারণ হার্ট রেট ৭২ বিপিএম হলে, তার জন্য হার্ট রেট ৮২ বিপিএম হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অন্য কারো সাথে তুলনা করার চেয়ে। সময়ের সাথে এই ট্রেন্ডটিও বোঝা জরুরি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছরের ব্যবধানে চেক-আপে হার্ট রেট বৃদ্ধি পাওয়া হৃদযন্ত্রের ব্যর্থতা এবং মৃত্যুঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে, যদিও এর কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম।
হার্ট রেট বৃদ্ধি কেবল একটি ক্লু
একজন ব্যক্তির রেস্টিং হার্ট রেট অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। ২৮,১৭৫ জন মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত মদ্যপান বা অসুস্থতার সময় হার্ট রেট গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, কঠোর প্রশিক্ষণ বা ঋতুস্রাবের সময় এই পরিবর্তন মাত্র ১-২ শতাংশ হয়।
যেহেতু অনেক কিছুই এই সংখ্যাকে প্রভাবিত করে, তাই গড়পড়তা বেশি হার্ট রেট মানেই কোনো কিছু পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ঠিক কী হয়েছে তা বলা কঠিন। এটি হতে পারে গত রাতের পানীয়, সংক্রমণের শুরু, কঠোর ব্যায়াম, হরমোন, নতুন ওষুধ বা খারাপ ঘুম। মাঝেমধ্যে হার্ট রেট অস্বাভাবিক হলে উদ্বেগের কিছু নেই, তবে বারবার এমনটি ঘটলে তা মনোযোগের দাবি রাখে।
ডিভাইস ভেদে রেস্টিং হার্ট রেট গণনা পদ্ধতি ভিন্ন
স্মার্টওয়াচ কোম্পানিগুলো “রেস্টিং হার্ট রেট” গণনার পদ্ধতিতে একমত নয়। অ্যাপল হার্ট রেট এবং শারীরিক নড়াচড়ার তথ্য সমন্বয় করে। গারমিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বনিম্ন ৩০ মিনিটের গড় হার্ট রেট গ্রহণ করে। ওরা (Oura) শুধু রাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে। তাই আপনার একই ডিভাইস থেকে পাওয়া ট্রেন্ড অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ। ডিভাইস পরিবর্তন করলে এই সংখ্যায় কিছুটা হেরফের হতে পারে।
একটি সংকেত হিসেবে হার্ট রেট পর্যবেক্ষণের জন্য দারুণ। এটি সহজ, নিয়মিত পরিমাপযোগ্য এবং বিশ্রামরত অবস্থায় বেশ নির্ভুল। আপনার স্বাভাবিক হার্ট রেট কত তা জেনে নিন, নিয়মিত কোনো পরিবর্তন হলে খেয়াল রাখুন। যদি হার্ট রেট স্থায়ীভাবে দ্রুত বা ধীর হয়ে যায় এবং তার সাথে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া বা বুক ব্যথার মতো লক্ষণ থাকে, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
Topics




