১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হলিউডে উদ্ভূত নোয়ার (noir) ধারার চলচ্চিত্রগুলি তাদের অনন্য নান্দনিকতা ও অসাধারণ সব নির্মাণের মাধ্যমে সিনেমার ইতিহাসে দুই দশক ধরে এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে। যদিও এর মূল স্বর্ণযুগ পেরিয়ে গেছে, তবুও গত প্রায় ১০০ বছর ধরে সিনেমার দুনিয়ায় নোয়ার ধারার এই বিশেষ নান্দনিকতা পরিচালকদের সর্বদা অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
২০২৫ সালের মে মাসের শেষদিকে মুক্তি পাওয়া ৮ পর্বের সিরিজ “স্পাইডার-নোয়ার” (Spider-Noir) সুপারহিরো চলচ্চিত্র প্রেমী এবং সিনেমার সমঝদার দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। পর্দায় প্রথমবারের মতো স্পাইডার-ম্যানের গল্পটিকে নোয়ার (noir) ধারায় তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে চরিত্রায়ন, দ্বন্দ্ব ও দৃশ্যপট নির্মাণে এক অনন্য নান্দনিকতা ফুটে উঠেছে।
বেন রাইলি (নিকোলাস কেজ অভিনীত) চরিত্রটির যাত্রায় দর্শক যেমন এক বিষণ্ণ ও জটিল সুপারহিরোর মানসিক দোটানা অনুভব করেন, তেমনি নোয়ার চলচ্চিত্রের সেই চিরচেনা রহস্যময় ও অ্যাকশনধর্মী আবহ উপভোগ করতে পারেন।
আরও পড়ুন: আমেরিকান সিনেমার ভিত্তি: মায়া ডেরেন ও চলচ্চিত্রের কাব্যিক ভাষা

Above গোয়েন্দা বেন রাইলি বা স্পাইডার-নোয়ার চরিত্রে নিকোলাস কেজ। ছবি: এমজিএম+
নির্মাতারা নোয়ার (noir) ধারার নান্দনিকতাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। বৃষ্টির রাত, জ্যাজ সংগীতের সুর, ধোঁয়াশাচ্ছন্ন বার এবং নিউ ইয়র্ক শহরের পটভূমি Spider-Noir-কে একটি ধ্রুপদী নোয়ার চলচ্চিত্রের আদল দিয়েছে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্পাইডার-ম্যানের পরিচিতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, এই সিরিজটি প্রমাণ করে যে নোয়ার ধারার প্রভাব আজও প্রাসঙ্গিক। ১৯৩০-এর দশকে হলিউডে উদ্ভূত এই ধারাটি বিশ ও ত্রিশের দশকে জার্মান অভিব্যক্তিবাদ (Expressionism) দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। সে সময় নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচতে আসা জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের সঙ্গে এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ১৯৩০ থেকে ১৯৫০-এর দশকের হলিউডকে এক নতুন রূপ দেয়।
উল্লেখ্য যে, এই ধারার বিকাশে রেমন্ড চ্যান্ডলার ও ড্যাচিয়েল হ্যামেটের মতো লেখকদের রূঢ় ও বাস্তবধর্মী গোয়েন্দা কাহিনী এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। তাদের এই অনন্য গল্পগুলো পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নতুনভাবে অনুপ্রেরণা জোগায়।

Above ‘ডাবল ইনডেমনিটি’ (Double Indemnity) চলচ্চিত্রের দৃশ্য।
নোয়ার ধারার চলচ্চিত্রের আলোকসজ্জা ও আবহ ছিল অনন্য। সাধারণত রাতের দৃশ্য, আলো-ছায়ার নাটকীয় বৈপরীত্য এবং কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে চিত্রায়িত এই চলচ্চিত্রগুলো এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। অফিস কক্ষ বা বারের মতো আবদ্ধ স্থানে নিয়ন আলোর ব্যবহার এবং ধোঁয়াশাচ্ছন্ন আবহ নোয়ার (noir) চলচ্চিত্রের স্বাদকে আরও গাঢ় করে তোলে।
প্রতিটি নোয়ার চলচ্চিত্রের শৈলী স্বতন্ত্র। ১৯৪৪ সালের “ডাবল ইনডেমনিটি” (Double Indemnity) চলচ্চিত্রটিকে এই ধারার একটি খসড়া হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে জন হিউস্টনের “দ্য মাল্টিজ ফ্যালকন” (The Maltese Falcon) পর্দায় এক কঠিন গোয়েন্দার ভাবমূর্তি তুলে ধরে। জ্যাক টার্নারের “আউট অফ দ্য পাস্ট” (Out of the Past) এবং বিলি ওয়াইল্ডারের “সানসেট বুলেভার্ড” (Sunset Boulevard) সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নোয়ার চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত।
আরও পড়ুন: চলচ্চিত্রের কাব্যিক চেতনা

Above বিলি ওয়াইল্ডার পরিচালিত ‘সানসেট বুলেভার্ড’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য।
অরসন ওয়েলস নোয়ার ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাতা। “দ্য থার্ড ম্যান” (The Third Man) ও “টাচ অফ ইভিল” (Touch of Evil)-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো এই ধারার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। বিশেষ করে “টাচ অফ ইভিল”-এর শুরুর ৩ মিনিটের অবিচ্ছিন্ন দৃশ্যটি আজও কিংবদন্তি হিসেবে সমাদৃত।
রবার্ট ওয়িনের “দ্য ক্যাবিনেট অফ ডক্টর ক্যালিগারি” (The Cabinet of Dr. Caligari) চলচ্চিত্রটিকে জার্মান অভিব্যক্তিবাদিতার উজ্জ্বল উদাহরণ ধরা হয়, যা পরোক্ষভাবে পরবর্তীতে নোয়ার চলচ্চিত্রের বিকাশে পথ দেখিয়েছে।

Above রবার্ট ওয়িনের ‘দ্য ক্যাবিনেট অফ ডক্টর ক্যালিগারি’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য।
অরসন ওয়েলসের কালজয়ী কাজ “সিটিজেন কেন” (Citizen Kane) মার্কিন সিনেমার ইতিহাসে এক মাইলফলক। যদিও উইন বা ওয়েলসের এই নির্দিষ্ট কাজগুলো সরাসরি নোয়ার ঘরানার না হলেও, এগুলোর নান্দনিকতা এই ধারার বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৫৫ সালের দিকে ধ্রুপদী নোয়ার ধারার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। তবে সত্তরের দশকের শেষদিকে ও আশির দশকে নতুন করে এই ঘরানার পুনর্জাগরণ ঘটে, যা নব্য-নোয়ার (neo-noir) বা নিও-নোয়ার নামে পরিচিতি পায়।

Above ‘এল.এ. কনফিডেনশিয়াল’ (L.A. Confidential) নিও-নোয়ার ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত।
রোমান পোলানস্কির “চায়নাটাউন” (Chinatown) নিও-নোয়ার ধারার এক অনন্য উদাহরণ, যার চিত্রনাট্য চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়াও “এল.এ. কনফিডেনশিয়াল”, “ব্লেড রানার”, “সেভেন” (Se7en) এবং ক্রিস্টোফার নোলানের “মেমেন্টো” (Memento) এই ধারার শ্রেষ্ঠত্বকে এগিয়ে নিয়েছে। ডেভিড লিঞ্চের রহস্যময় চলচ্চিত্র “মালহল্যান্ড ড্রাইভ” (Mulholland Drive) আধুনিক সিনেমায় নোয়ার নান্দনিকতার সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের এক অপূর্ব সংযোগ ঘটিয়েছে।
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নোয়ার (noir) ধারার অবদান অনস্বীকার্য। আজও অগণিত চলচ্চিত্র নোয়ার ধারার সেই চরিত্র, আবহ ও শৈলী থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নির্মিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
অলিভিয়া রদ্রিগোর ব্রেকআপ গানের সুর: “ইউ সিম প্রিটি স্যাড ফর এ গার্ল সো ইন লাভ”




