হংকংয়ের “Jewellery & Gem World Hong Kong” মেলায় গয়না ব্যবসায়ীরা কেন বারবার ফিরে আসেন, তা নিয়ে টাটলারের অনুসন্ধান
হংকং প্রতি বছর তিনবার বড় ধরনের গয়নার মেলার আয়োজন করে, যার পরবর্তীটি আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে যাচ্ছে। “Jewellery & Gem World Hong Kong”, যা আগে সেপ্টেম্বর হংকং জুয়েলারি অ্যান্ড জেম ফেয়ার নামে পরিচিত ছিল এবং মানুষের কাছে হংকংয়ের গয়নার মেলা হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়, ১৪ সেপ্টেম্বর এশিয়াওয়ার্ল্ড-এক্সপোতে তার যাত্রা শুরু করবে। এই মেলার দ্বিতীয় অংশটি ১৬ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হংকং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে চলবে, যেখানে তৈরি গয়না প্রদর্শিত হবে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর সংস্করণে ৪৪টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৩,১০৩ জন প্রদর্শক অংশগ্রহণ করেছিলেন। এতে ১৪১টি দেশ থেকে ৫৫,১৭৬ জন ক্রেতা এসেছিলেন, যার ৬৯ শতাংশই ছিলেন হংকংয়ের বাইরের। মার্চের বোন মেলা, ৪২তম হংকং ইন্টারন্যাশনাল জুয়েলারি শো-তে প্রায় ৪,০০০ প্রদর্শক ও ৮০,০০০ ক্রেতা অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ায় কিছু প্রদর্শক অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও মেলাটি তার জৌলুস বজায় রেখেছিল।
হংকং ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী মেলার ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী। বিশেষ করে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের নেতৃত্বে নতুন “হার্ড পিওর গোল্ড প্যাভিলিয়ন” এবং কোরিয়ান ব্র্যান্ডগুলোর প্রথম অংশগ্রহণ এই আশার পালে হাওয়া দিয়েছে।

Above Jewellery & Gem World Hong Kong মেলার ২০২৫ সালের আয়োজন (ছবি: Jewellery & Gem World Hong Kong-এর সৌজন্যে)
এই মেলার বিশালত্বের পেছনে কেবল মেলাটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনা দায়ী নয়; বরং এটি একটি সুদীর্ঘ ইতিহাসের ফল। কেন হংকংয়ে প্রতি বছর তিনটি বড় গয়নার মেলা হয় এবং কেন ক্রেতারা বারবার এখানে ফিরে আসেন, তার পেছনে রয়েছে বহু দশকের পুরনো বাণিজ্যিক নীতি।
হংকংয়ের ফ্রি-পোর্ট বা শুল্কমুক্ত বন্দরের কথা প্রথমেই বলতে হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকাকালীন সময় থেকেই হংকংয়ে মূল্যবান ধাতু বা রত্ন আমদানিতে কোনো শুল্ক নেওয়া হয় না। আন্তর্জাতিক হীরা ও রত্ন ব্যবসায়ীরা ষাটের দশক থেকেই তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম হংকংয়ে পরিচালনা করে আসছেন, কারণ এই শুল্কমুক্ত সুবিধায় খুব সহজে সারা বিশ্বে পাথর সরবরাহ করা যায়।
১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত চাইনিজ গোল্ড অ্যান্ড সিলভার এক্সচেঞ্জ সোসাইটি হংকংয়ের স্বর্ণ ও রৌপ্য ব্যবসার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ২০২৫ সালে এটি হংকং গোল্ড এক্সচেঞ্জ হিসেবে পুনর্গঠিত হয়, যা শহরটিকে লন্ডন ও নিউ ইয়র্কের মতো বুলিয়ন ট্রেডিং সেন্টারে পরিণত করার সরকারি উদ্যোগের একটি অংশ। মূলত গয়নার মেলার অনেক আগেই হংকং মূল্যবান ধাতুর ব্যবসার অবকাঠামো তৈরি করে ফেলেছিল।

Above প্রতি সেপ্টেম্বরে হংকংয়ের এই প্রতীক্ষিত মেলায় রত্ন পাথরের সেরা ব্যবসায়ীরা এক ছাদের নিচে জড়ো হন (ছবি: Jewellery & Gem World Hong Kong-এর সৌজন্যে)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হীরার ব্যবহার হংকংয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ এটি বহন করা ও লুকিয়ে রাখা সহজ ছিল। ১৯৪৯ সালের পর অনেক সাংহাইয়ের গয়না ব্যবসায়ী হংকংয়ে স্থানান্তরিত হন, যারা তাদের সাথে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রত্ন খোদাই ও মুক্তার ব্যবসার দক্ষতা নিয়ে আসেন। হংকংয়ের ডায়মন্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ১৯৫৯ সালে গঠিত হয়। সত্তরের দশকে এখানে গয়না তৈরির নিজস্ব কারখানা গড়ে ওঠে এবং হংকং আন্তর্জাতিকভাবে রত্ন ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
“Jewellery & Gem World Hong Kong”-এর বর্তমান রূপের পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৪ সালে হংকং ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের মাধ্যমে মেলাটির সূচনা হয়। এরপর থেকে হংকংয়ের এই মেলাগুলোর মাধ্যমে শহরটি এশিয়ার গয়নার কেন্দ্র বা জুয়েলারি হাব হিসেবে পরিচিতি পায়।
মিস করবেন না: প্যারিসে পোমেলাতোর নতুন বিপ্লব, গয়নার দুনিয়ায় পরিবর্তনের ডাক

Above এই মেলায় আপনি নিশ্চিতভাবেই অসাধারণ সব গয়নার দেখা পাবেন (ছবি: Jewellery & Gem World Hong Kong-এর সৌজন্যে)
১৯৯৭ সালের পর হংকংয়ের শুল্কমুক্ত বন্দরের মর্যাদা ও বাণিজ্যিক সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকে। ২০০৬ সালের সিইপিএ (CEPA) চুক্তির মাধ্যমে হংকংয়ে উৎপাদিত গয়না শুল্কমুক্তভাবে চীনে প্রবেশের সুযোগ পায়, যা সে সময় বিশ্বের বৃহত্তম গয়নার বাজারে পরিণত হচ্ছিল। ২০২৪ সালে হংকং ১৮.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের গয়না আমদানি করে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে।
সুতরাং যখন ১৪ সেপ্টেম্বর “Jewellery & Gem World Hong Kong” মেলাটি তার দুয়ার উন্মোচন করবে, তখন মনে রাখতে হবে যে এর সাফল্যের পেছনে রয়েছে ১শ১৬ বছরের পুরনো স্বর্ণের বাজার এবং আধুনিক বাণিজ্যিক নীতি। গয়না ব্যবসার দুনিয়ায় হংকংয়ের আধিপত্য কেবল মেলা নয়, বরং এর দীর্ঘকালীন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারই প্রতিফলন।
Topics





