বৈচিত্র্য, সাম্য এবং ইনক্লুশন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের অগ্রদূত লিন আর লি মনে করেন, প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসে যখন নীতিমালা দৈনন্দিন সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে এবং আমাদের ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপগুলো প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে নতুন রূপ দেয়।
অধিকাংশ মানুষ কোনো ভাবনা ছাড়াই এসব দরজা দিয়ে চলাচল করেন। লন্ডনের শেল সেন্টারে অবস্থিত জ্বালানি কোম্পানিটির ভবনের সংযোগকারী সেতুগুলোর স্বয়ংক্রিয় দরজাগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু একবার একটি দরজা অকেজো হয়ে পড়ে। অনেকের কাছে এটি সামান্য বিড়ম্বনার বিষয় ছিল। কিন্তু যারা হুইলচেয়ারে চলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা যাদের চলাচলে বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন, তাদের জন্য এটি একটি বড় বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লিন আর লি এই ঘটনাটি মনে রেখেছেন কারণ একজন ব্যক্তি এটি লক্ষ্য করেছিলেন। প্রতিবন্ধীদের ইনক্লুশন বা অন্তর্ভুক্তিকরণ নিয়ে কাজ করা এক নেতা সমস্যাটি দেখে তা রিপোর্ট করেন এবং মেরামত না হওয়া পর্যন্ত খোঁজখবর নেন। লিন বলেন, “তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে দরজাটি ঠিক হয়েছে। এটি মূলত কাজের বাস্তবায়নের বিষয়। নীতিমালা আছে, মানুষ তা বোঝেও, কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে কি আমরা বাধা দূর করতে সত্যিই সচেতন?” লিনের কাছে, ইনক্লুশন হলো অন্যদের এড়িয়ে যাওয়া বিষয়গুলো লক্ষ্য করার আগ্রহ, যা কেবল তখনই সফল হয় যখন তা আমাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
এই ছোট পদক্ষেপটির মধ্যেই লিনের সারাজীবনের কাজের মূলমন্ত্র লুকিয়ে আছে। তাঁর মতে, ইনক্লুশন একটি অভ্যাসের মতো, যা বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে সংস্কৃতির রূপ নেয়। এই এপ্রিলে তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে এবং যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বাইরের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে লন্ডনের এইচএসবিসি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজনেস ডিজএবিলিটি ফোরামের ‘ডিজএবিলিটি স্মার্ট ইমপ্যাক্ট লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি আমার জন্য একটি মাইলফলক এবং ইনক্লুশন বা ডিইআই (বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিকরণ) কাজের জন্য বড় স্বীকৃতি। এটি এশীয় কণ্ঠস্বর ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।”
আরও পড়ুন: প্রতিবন্ধীদের জন্য ইনক্লুশন নিশ্চিতকরণে এশিয়ার অগ্রগতি

Above শেল কোম্পানিতে দুই দশকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন লিন আর লি, যেখানে তিনি প্রথম এশীয় ও নারী গ্লোবাল চিফ ডিইআই অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন (ছবি: লিন আর লি)
শেল কোম্পানিতে দুই দশকেরও বেশি সময় কাজ করেছেন লিন আর লি। ২০১৮ সালে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি এমন এক বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন, যা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার বাইরে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনে দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দেয়। এর অর্থ ছিল সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন, কর্মসংস্কৃতি গঠন এবং কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। কর্মীরা যাতে সাহসিকতার সঙ্গে কথা বলতে পারে এবং পেশাগতভাবে বিকশিত হতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
লিন বলেন, “মানুষ যখন ইনক্লুশন বা ডিইআই নিয়ে প্রশ্ন করে যে, ‘এখন আমাদের কী করতে হবে?’ এর উত্তর নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর। আপনি কোথায় কাজ করছেন এবং কী ধরনের প্রভাব ফেলতে চাইছেন, তার ওপর সব কিছু নির্ভর করে।” তিনি বিশ্বাস করেন, পরিপক্ক ও উদীয়মান বাজারের মধ্যে যে ব্যবধান, সেখানে সুযোগ রয়েছে এবং গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার সমন্বয় করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।
শেলের মতো কোম্পানিতে এশীয় নারী হিসেবে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, কার্যকর নেতৃত্বের জন্য প্রচলিত ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে জায়গা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “অনেক সময় প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল কেন্দ্রের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু যারা সিদ্ধান্তের ফলাফল ভোগ করে, তারা এমন অনেক কিছু দেখতে পায় যা নেতারা মিস করে যান। তাই বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা শোনা ইনক্লুশন কাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি।”

Above এ বছর এপ্রিলে লিন আর লি বিজনেস ডিজএবিলিটি ফোরাম থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন (ছবি: লিন আর লি)
প্রতিবন্ধীদের ইনক্লুশন বিষয়টি লিনের এই নীতিকে আরও শাণিত করেছে। তিনি মনে করেন, এখনো অনেক সমাজে প্রতিবন্ধীদের করুণা বা সীমিত প্রত্যাশার দৃষ্টিতে দেখা হয়। তিনি প্রশ্ন করেন, “প্রতিবন্ধীদের কি করুণার চোখে দেখা উচিত, নাকি তাদের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?” লিনের মতে, সমস্যাটি তাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে নেই, বরং সমস্যাটি হলো আমাদের ভবন, ডিজিটাল সিস্টেম এবং প্রচলিত অভ্যাসগুলোর ডিজাইনে, যা কেবল সুস্থ বা সক্ষম মানুষের কথা ভেবে করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের জন্য এই আলোচনাটি এখন অত্যন্ত জরুরি। লিনের মতে, চ্যালেঞ্জটি হলো নীতিমালার গণ্ডি পেরিয়ে দৈনন্দিন সংস্কৃতি ও আচরণে ইনক্লুশন বা অন্তর্ভুক্তিকে জায়গা দেওয়া। আমাদের কর্মক্ষেত্র, বোর্ডরুম ও জনসমাগমস্থলে ইনক্লুশন কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ভালো ব্যবসার অংশ।
তিনি বলেন, “ইনক্লুশন মানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য আলাদা সমাধান তৈরি করা নয়, বরং এমন সব প্রতিষ্ঠান ও সেবা তৈরি করা যা মানুষের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতাকে মর্যাদা দেয়। যদি কোনো ব্যাংকিং ফর্ম স্ক্রিন রিডারের জন্য উপযুক্ত না হয় বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের কথা ভাবা না হয়, তবে বুঝতে হবে এটি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি ব্যর্থতা।”
মিস করে থাকলে পড়ুন: “আপনাকে তো অটিস্টিক মনে হয় না”: কেন নিউরোডাইভারজেন্ট নারীদের এড়িয়ে চলা হয়
২০২৪ সালে শেল ছাড়ার পর থেকে লিন আর লি সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। তিনি মনে করেন, ইনক্লুশন ও সমাজসেবার ছোট ছোট কাজগুলো হলো চালের দানার মতো; যা খুব ক্ষুদ্র মনে হলেও একত্রিত হয়ে অনেক বড় কিছু তৈরি করতে পারে। তার প্রথম বই ‘টাইনি রাইস গ্রেইনস’ বা ‘ছোট চালের দানা’ আসলে এই উদারতাই প্রকাশ করে।
যারা কাজের ফলাফলে কেবল সংখ্যার হিসাব খোঁজেন, তাদের লিন মনে করিয়ে দেন যে ইনক্লুশন কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়; এটি বাস্তব ফলাফল তৈরি করে। মানুষ যখন নিজেকে সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তখন তারা কাজে আরও বেশি অনুপ্রাণিত থাকে। একইভাবে, যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহকদের বৈচিত্র্যময় চাহিদাগুলো বুঝতে পারে, তারা গ্রাহকের আস্থা ও আনুগত্য অর্জনে আরও বেশি সক্ষম হয়। তিনি বলেন, “যদি আপনার কথা শোনা হয় এবং আপনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে আপনার কর্মক্ষমতা ও কাজের প্রতি সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাবে।”





