Runa Khan interacting with women participating in Friendship’s adult literacy programme (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Cover ফ্রেন্ডশিপের বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া নারীদের সাথে রুণা খান (ছবি: র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে)।
Runa Khan interacting with women participating in Friendship’s adult literacy programme (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)

২০২৬ সালের র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার বিজয়ী রুণা খান বাংলাদেশ, তাঁর কাজের প্রভাব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কথা বলেছেন।

রুণা খানের কাছে দারিদ্র্য কখনোই অদৃশ্য ছিল না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আপনি যেকোনো শ্রেণিতেই থাকুন না কেন, দারিদ্র্যের মুখোমুখি হবেনই। শহরের অধিকাংশ মানুষই এটি উপেক্ষা করে চলতে শেখেন। তিনি বলেন, “অনেকে গাড়ির জানালা বন্ধ করে দেন।” কিন্তু যখন তিনি নদী দ্বীপগুলোতে ভ্রমণ করলেন, তখন সেই না দেখার অভ্যাসটি আর কাজ করেনি।

সেটি ছিল সন্ধ্যাবেলা, প্রায় ছটা। একজন নারী তাঁর সন্তানকে ভাত আর পেঁয়াজ খাওয়াচ্ছিলেন। শিশুটি কিছুটা অসুস্থ ছিল, তাই রুণা খান তাঁকে পরামর্শ দিলেন যে, তিনি যেন পরে খাওয়ান। সেই নারী জানালেন, তিনি দিনে দুবার খেতে পান, তাই বিষয়টি তা নয়। শিশুটি এখন ঘুমালে হয়তো জ্বরের কথা ভুলে সারা রাত ঘুমাতে পারবে। কিন্তু একটি প্রদীপের জন্য সলতে আর তেলের প্রয়োজন, আর তেল কেনার টাকা তাঁর কাছে ছিল না।

“আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এটার দাম তো মাত্র এক থেকে দুই সেন্ট,” রুণা খান স্মৃতিচারণ করেন। “আমি শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর কাঁদছিলাম। প্রথমে বিষণ্ণতা, তারপর রাগের উদ্রেক হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, ‘এটি কীভাবে সম্ভব?’”

তাঁর যে বিষয়টি বিচলিত করেছিল তা হলো সেই নারীর মর্যাদা। “এই নারী তাঁর সামান্য ঘর নিয়েও কতটা গর্বিত ছিলেন।” তিনি বলেন। এই অবিচার স্পষ্ট ছিল। “আমার সন্তান, তাঁর সন্তান, প্রধানমন্ত্রীর সন্তান, আমার বন্ধুদের সন্তানেরা সবাই একই মাটিতে জন্মেছে, তাহলে এমন বৈষম্য থাকবে কেন?”

তাঁর এই রাগ তাঁকে পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করেছিল। এটি তাঁর কর্তব্যে পরিণত হয়। “উপলব্ধি থেকে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। আপনি যখন কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখেন, তখন সেটিই আপনার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।” তাঁর বাবা তাঁকে আগেই স্বাস্থ্যসেবার দিকে মনোযোগী হতে বলেছিলেন, আর দ্বীপের মানুষের অবস্থা তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিল কোথায় সেই সেবার প্রয়োজন। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই ২০০২ সালে ‘ফ্রেন্ডশিপ’ বা বন্ধুত্ব-এর জন্ম।

আরও পড়ুন: ২০২৬ সালের র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পেলেন বিশ্বের পরিবর্তনকারী তিন অসামান্য ব্যক্তি

Tatler Asia
Above রুণা খান স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করছেন (ছবি: র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে)।
Tatler Asia
Runa Khan taking part in a community discussion session with women in the chars (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Above চর অঞ্চলে নারীদের সাথে আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন রুণা খান (ছবি: র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে)।
Runa Khan taking part in a community discussion session with women in the chars (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)

রুণা খান সরাসরি সাহায্যকারী সংস্থার গণ্ডি থেকে আসেননি। ১৯৫৮ সালে জমিদার বংশীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করা রুণা খান বিহারি ও স্থানীয় কারিগরদের কাজের সুযোগ দিতে ১৯৮৮ সালে একটি বুটিক খুলেছিলেন। তিনি পারিবারিক প্রিন্টিং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পুরনো কাঠের নৌকা মেরামত করে নদী ভ্রমণের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি ১৯৯৪ সালে অশোকা ফেলো এবং ২০০৬ সালে বাংলাদেশের নৌকা তৈরির ঐতিহ্য রক্ষার কাজের জন্য রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড ফর এন্টারপ্রাইজ জিতেছিলেন।

ফ্রেন্ডশিপের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি ভাসমান হাসপাতাল হিসেবে, যা চরের মানুষের সেবা করতো। তিনি বলেন, “আমি এই কাজ শুরু করেছি কারণ আমি আমার চোখের সামনে দেখা চরম দারিদ্র্যকে উপেক্ষা করে দূরে থাকতে পারিনি।” বর্তমানে এটি সাতটি হাসপাতাল জাহাজ, দুটি স্থল হাসপাতাল, ৫৫০টি ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিক ও ৭০০ প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীসহ ৭ হাজার কর্মীর একটি বিশাল সংগঠনে পরিণত হয়েছে। তারা প্রতি বছর প্রায় ৭৫ লক্ষ মানুষকে সেবা প্রদান করে, যা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এটি ‘ফিক্স আওয়ার ক্লাইমেট’ বিভাগে আর্থশট প্রাইজ জয় করে। র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন রুণা খানের গভীর সহমর্মিতা ও সাহসিকতাকে সম্মান জানিয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, স্বাস্থ্যসেবার অগ্রাধিকার আগে ছিল, কারণ আহত ব্যক্তি অন্য সবকিছুর আগে ক্ষত নিরাময় চান। তারপর এসেছিল ঝড়, আয় ও বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা। তিনি বড় কোনো কৌশলের কথা অস্বীকার করেন। “আমি উন্নয়ন নিয়ে কোনো বই পড়িনি। এটি সব সম্প্রদায়ের চাহিদা থেকে এসেছে। আমি মানুষের কথা শুনেছি এবং তারা যা বলেনি তাও বোঝার চেষ্টা করেছি, কারণ না বলা কথার মাঝেই থাকে প্রকৃত ব্যথা।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবকিছুর সঙ্গেই জড়িত। ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান বিদ্যালয়গুলোকেও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বারবার সরিয়ে নিতে হয়। “২০১৮ সালে এক বছরেই ১৬টি স্কুল সরাতে হয়েছিল। সমস্যা বোঝার জন্য আমার কোনো বিজ্ঞানী বা রকেট সায়েন্টিস্টের প্রয়োজন নেই। আমি প্রতিদিন এটি অনুভব করি।” ফ্রেন্ডশিপ এখন বাংলাদেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনায়নকারী সংস্থা।

আরও পড়ুন: কেন ন্যায়বিচারের লড়াই কেবল নির্বাচিত কয়েকজনের জন্য নয়, জানালেন র্যামন ম্যাগসেসে ২০২৬ পুরস্কার বিজয়ী বো কি

Tatler Asia
Friendship’s floating hospital providing care (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Above ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান (ছবি: র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে)।
Friendship’s floating hospital providing care (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Tatler Asia
Friendship Primary School (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Above ফ্রেন্ডশিপের উদ্যোগে পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্য (ছবি: র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে)।
Friendship Primary School (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)

খান সংখ্যার চেয়ে মানুষকে বেশি গুরুত্ব দেন। ভার্মিকম্পোস্টিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক বিধবা নারী এখন মাসে এক লক্ষ টাকা আয় করেন। ফ্রেন্ডশিপ তাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খবর রাখে। “আপনি তাদের দাঁড়ানোর জন্য একটি মজবুত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিচ্ছেন, চোরাবালি নয়।”

তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তিনি আপসহীন। যে দাতার মূল্যবোধ তাঁর সঙ্গে মেলেনি, তিনি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। “তারা ১০ ডলার দিচ্ছে নাকি ২০ লক্ষ ডলার, তা আমার কাছে বড় কথা নয়।” শুরুর দিকের প্রতিকূলতার কথা তিনি অকপটে বলেন। “আমি মাঝরাতে হাঁটু পর্যন্ত কাঁদায় দাঁড়িয়ে নৌকার সমস্যা সমাধান করেছি।” সংবাদ সম্মেলনে তাঁর পরনের শাড়িটিও ফ্রেন্ডশিপ দ্বারা সমর্থিত সম্প্রদায়ের তৈরি।

সম্পদ ও অধিকার সম্পর্কে তাঁর তিনটি নিয়ম হলো: কিছুটা দান করা, কিছুটা ভবিষ্যতের জন্য জমানো এবং কিছুটা প্রয়োজন মেটানো। “টাকা কেবল একটি হাতিয়ার।”

তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ হলো ‘ফ্রেন্ডশিপ একাডেমি’। তিনি বলেন, “আমি অন্য দেশে গিয়ে এটি হুবহু নকল করতে চাই না। এটি খুবই সেকেলে ঔপনিবেশিক মানসিকতা। আপনার দেশের জন্য কী প্রয়োজন তা আপনিই ভালো বুঝবেন। আমার কাছে এটাই সম্মান।”

Tatler Asia
Runa Khan outside the outpatient ward during a Friendship medical health camp (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Above ফ্রেন্ডশিপ মেডিকেল ক্যাম্পের বহির্বিভাগে রোগীদের সেবায় ব্যস্ত রুণা খান (ছবি: র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে)।
Runa Khan outside the outpatient ward during a Friendship medical health camp (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Tatler Asia
Runa Khan outside a Friendship hospital ship during a health camp, interacting with a child (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)
Above হাসপাতাল জাহাজে এক শিশুর সাথে আলাপ করছেন রুণা খান (ছবি: র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে)।
Runa Khan outside a Friendship hospital ship during a health camp, interacting with a child (Photo: courtesy of Ramon Magsaysay Award Foundation)

বিত্তশালী ও দরিদ্রের মধ্যে সাধারণ সাদৃশ্য কী—এই প্রশ্নের উত্তরে রুণা খান খুব সহজ উত্তর দেন। “রক্ত সবারই লাল।” সহমর্মিতা ছাড়া এই সাদৃশ্য অনুভব করা কঠিন।

তিনি বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, “আমি বিশ্বের ধনী ও রাজনীতিবিদদের কাছে আবেদন করব, যখন আপনারা যুদ্ধের কথা বলেন, তখন ভাবুন এটি আপনাদের সন্তান হতে পারে। যখন আপনি কোনো অসহায় বৃদ্ধাকে দেখেন, মনে করবেন এটি আপনার নিজের মা হতে পারে।”

তিনি যোগ করেন, “এই সহমর্মিতাই আমার কাম্য।”

আরও পড়ুন

কেন নেতাদের সংঘাত ব্যক্তিগত করা উচিত নয়, মত র্যামন ম্যাগসেসে ২০২৬ পুরস্কার বিজয়ী টমি কোহ-এর

৬৭তম র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের ঝলক

কেন এই ফিলিপিনো উদ্যোক্তা সেবাকে নেতৃত্বের সর্বোত্তম রূপ বলে মনে করেন

Topics