এই বছর লন্ডনের সবচেয়ে আলোচিত আর্ট ফেয়ার ফ্রাইজ-এর ভেতরে কী ঘটল? রিজেন্ট পার্কের সাদা তাঁবুর নেপথ্যের গল্প জানালেন রোসানা লাই।
ফ্রাইজ লন্ডন-এ পা রাখতেই হঠাৎ দেখা হয়ে গেল সাবেক স্পাইডার-ম্যান তারকা অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের সঙ্গে। একটি কর্ডুরয় টুপি পরে আড়ালে থাকার চেষ্টা করছিলেন তিনি, সঙ্গে ছিলেন তাঁর সঙ্গী ও অভিনেত্রী মনিকা বারবারো। কিন্তু উদ্বোধনী দিনে গ্যালারির উৎসাহী মালিক ও সংগ্রাহকরা এই হলিউড তারকার উপস্থিতিতে তেমন কোনো ভ্রূক্ষেপই করেননি; কারণ এখানে প্রকৃত আকর্ষণ হলো দেওয়ালে টাঙানো শিল্পকর্মগুলো।
বিশ্বের অন্যতম সেরা সমসাময়িক আর্ট ফেয়ার ফ্রাইজ লন্ডন প্রতি বছর রিজেন্ট পার্কে তাদের বার্ষিক সম্মেলন আয়োজন করে। ৪৩টি দেশ ও অঞ্চলের ১৭৬টি গ্যালারি থেকে আসা শিল্পীদের কাজ দেখতে ও কিনতে সেখানে ভিড় জমান অসংখ্য দর্শক। এই ফ্রাইজ লন্ডন শিল্পরসিকদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।
আরও পড়ুন: ইস্তাম্বুলের ৫০০ বছরের পুরনো হামামে সমসাময়িক শিল্পের এক অপূর্ব মিলনমেলা

Above কার্লোস ইশিকাওয়া গ্যালারিতে প্রদর্শিত ইসি উডের শিল্পকর্ম, সৌজন্যে ফ্রাইজ লন্ডন। ফ্রাইজ লন্ডন আর্ট ফেয়ারে এই শিল্পকর্মটি বিশেষ নজর কেড়েছে।
এবারের ২৪তম আয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান গ্যালারিগুলোতে ছিল বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী একক প্রদর্শনী। এর মধ্যে লিসন গ্যালারিতে ব্রাজিলীয় চিত্রশিল্পী ডাল্টন পলা, গাগোসিয়ান গ্যালারিতে জার্মান শিল্পী আলবার্ট ওহলেন এবং পেস গ্যালারিতে ব্রাজিলের মারিনা পেরেজ সিমাওয়ের কাজ ছিল অন্যতম। এবারের ফ্রাইজ লন্ডন-এ এশীয় শিল্পীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বেইজিং ইনসাইড-আউট আর্ট মিউজিয়ামের পরিচালক ক্যারল ইংহুয়া লু-এর তত্ত্বাবধানে ‘দ্য কোড ইউনিভার্স’ অংশে অনেক এশীয় শিল্পীর কাজ প্রাধান্য পেয়েছে।
গত অর্ধ শতাব্দীর শিল্পকর্মের সমন্বয়ে সাজানো এই অংশে এমন সব শিল্পীদের কাজ তুলে ধরা হয়েছে যারা পপ এবং কনসেপচুয়াল আর্ট নিয়ে কাজ করেন। এখানে প্রয়াত বালিনিজ চিত্রশিল্পী ওতুতল-এর চাইনিজ কালি ও ক্যানভাসে আঁকা চিত্রগুলো দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। এরপর আমি বিখ্যাত সিঙ্গাপুরের গ্যালারি আমেস ইয়াভুজ-এ যাই, যেখানে ছিল থাই শিল্পী পিনারি সানপিতাখের ভাস্কর্য। এছাড়া কুকজে গ্যালারিতে অনীশ কাপুরের আয়না এবং কোয়াংহো লি-এর একটি চমৎকার চিত্রকর্ম ছিল ফ্রাইজ লন্ডন-এর অন্যতম আকর্ষণ।
আরও পড়ুন: সিঙ্গাপুরের প্রথম হাত-নিয়ন্ত্রিত লাইট ইন্সটলেশনসহ একটি ড্যাটাচড হাউস
এরপর আমি যাই কলকাতা-ভিত্তিক গ্যালারি এক্সপেরিমেন্টারে। সেখানে রাধিকা খিমজির চমৎকার একটি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছিল। এছাড়াও মুম্বাইভিত্তিক চাণক্য স্কুল অফ ক্রাফট-এর হাতে বোনা শিল্পকর্মগুলো ছিল দেখার মতো। ফ্রাইজ লন্ডন-এ তাদের এই শিল্পকর্মগুলো প্রদর্শিত হতে দেখে ভালো লাগল। সাচি ইয়েটস গ্যালারির প্রাক্তন পরিচালক তাহিরা চাওলা বলেন, ‘চাণক্য স্কুলের কাজগুলো অত্যন্ত শৈল্পিক।’
ফ্রাইজ সিউলের সাফল্যের পর লন্ডন প্রোগ্রামেও পূর্ব এশীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। ফ্রাইজ লন্ডন-এর এক প্যানেল আলোচনায় শিল্পী মার্ক মিংগু চো বলেন, ‘কোরিয়ান গ্যালারিগুলোর জন্য তাদের গল্প পশ্চিমে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ব্যবসার প্রসার ঘটানো খুবই জরুরি। ফ্রাইজ লন্ডন এখনও একটি বৈশ্বিক ইভেন্ট, তাই এখানে এশীয় শিল্পীদের উপস্থিতি খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
আরও পড়ুন: ব্র্যান্ডেড রেসিডেন্স: কেন স্থপতিরা নিজেই ব্র্যান্ড হয়ে উঠছেন?
ফ্রাইজ লন্ডন-এর সৌন্দর্য শুধু শিল্পকর্ম নয়, বরং দর্শকদের রুচিশীল ফ্যাশন সচেতনতাও বটে। এই মেলাটি বিলাসবহুল ফ্যাশন ও হসপিটালিটি ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও দারুণ এক সুযোগ। শিল্পরসিকরা ডানহিল-এর ফ্রাইজ মাস্টার্স টকস-এ অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সেশনস আর্টস ক্লাবে খাবার উপভোগ করেছেন। সব মিলিয়ে ফ্রাইজ লন্ডন-এর প্রতিটি কোণে শিল্পের ছোঁয়া স্পষ্ট।
প্রথম দিনের শেষে শোনা গেল দারুণ একটি খবর: ১৬শ শতাব্দীর চিত্রশিল্পী জান ব্রুগেল দ্য এলডারের আঁকা ‘স্টিল লাইফ অফ ফ্লাওয়ার্স ইন আ স্টোনওয়্যার ভেস’ চিত্রকর্মটি Hauser & Wirth গ্যালারি ৫ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করেছে। এই বিক্রির মাধ্যমে ফ্রাইজ লন্ডন ২০২৬-এর এবারের আয়োজন অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়ল।





